শিশির ভট্টাচার্য: ১৯৬৯ সালের এক সন্ধ্যা। আমি সদ্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে খালাস পেয়েছি। আইউব খান কয়েক দিন আগে, ২৫শে মার্চ পদত্যাগ করেছেন। বাসায় লোকজন ছিল না। ঢাকার পরিস্থিতি একটু থমথমে। আমি ছাদে পায়চারি করছিলাম। নিচের দিকে চোখ পড়াতে দেখি, সিরাজ এসেছে এবং রেণু তাকে ছাদের দিকে ইঙ্গিত করছে।

‘বাসা দেখি একেবারে খালি। কী ব্যাপার মুজিবভাই?’

‘আর বলিস না। আওয়ামী লীগের লোকেরা ভীতুর ডিম একেকটা। সুখের পায়রা সব। দুর্দিনে ৩২ নম্বরে কেউ আসে না। তুই ভাই এই কয়েক দিন রেগুলার আসাযাওয়া করিস। কথা বলারই লোক পাই না রে।’

সামরিক শাসন জারি হয়েছে। মিছিল-মিটিং করা যাবে না। কিন্তু দল গোছানো যায়, গোছাতে হবে, কারণ ইয়াহিয়া খান ‘এক মানুষ এক ভোট’ ভিত্তিক নির্বাচন দেবার কথা বলেছে তার ভাষণে।

জয়বাংলা! ১৯৬৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভায় আফতাব উদ্দিন আহমেদ নামে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের এক ছাত্র নাকি সর্বপ্রথম ‘জয়বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেছিল – সিরাজের কাছে শুনেছি। যেদিন প্রথম শুনেছি, সেদিনই আমার প্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছে এই স্লোগান। কিন্তু আমি শেখ মুজিব পছন্দ করলে হবে কী, স্লোগানটি নিয়ে ঘোরতর আপত্তি রয়েছে আওয়ামী লীগের ভিতরেই। তাজউদ্দিন ছাড়া প্রায় কেউই ‘জয়বাংলা’ স্লোগান পছন্দ করে না। ছাত্রলীগেও সিরাজ এবং অন্য দুই একজন মাত্র এই স্লোগানের পক্ষে। আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটিতে এই স্লোগান নিয়ে যখন আলাপ হচ্ছিল, তখন বেশির ভাগ সদস্য এটিকে ভারতঘেঁসা, ভারতের ‘জয় হিন্দ’ কিংবা সিন্ধু প্রদেশের ‘জিয়ে সিন্ধ’ এর নকল বলে হাসাহাসি করেছিল। আওয়ামী লীগেও ভারতবিরোধী লোকই বেশি। ওবায়দুর রহমান ওদের প্রতিনিধি হয়ে এসে সিরাজের উপস্থিতিতে আমাকে ‘জয়বাংলা’ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে গেছে: ‘সিরাজরা দিনে-দুপুরে, রাতে-বিরাতে যখন খুশি ‘জয়বাংলা’ বলে চিৎকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে খুশি!’ ‘ওটা তোমরা আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি দেখবো!’ বলে ওবায়দুর রহমানকে বিদায় করেছিলাম।

১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাস। আওয়ামী লীগ তখন আবার ভাগ হয়ে গেছে। ঢাকা শহরে আওয়ামী লীগের জনা বিশেক সক্রিয় সদস্য ছিল কিনা সন্দেহ। আমার মামা শ্বশুর সালাম খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ সদস্য পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে (পিডিএম) চলে গেছে। এই দল ছয় দফার ঘোর বিরোধী। মিছিল-মিটিং করার জন্যে সিরাজের নিউক্লিয়াস এবং বিএলএফ আপাতত আওয়ামী লীগের একমাত্র সম্বল, অন্ততপক্ষে ঢাকা শহরে।

১৯৭০ সালের ১৮ই জানুয়ারি। পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভা হচ্ছে। সভা শুরু হবার মিনিট দশেক আগে মঞ্চের দুই দিকে দুটি বড় বড় বোর্ড লাগিয়ে দিল সিরাজ। একটিতে লেখা ছিল: ‘জয়’ এবং অন্যটিতে: ‘বাংলা’। সিরাজের নির্দেশে উজ্জ্বল লালরঙে ‘জয়’ আর ‘বাংলা’ লিখে দিয়েছিল কোলকাতার ছেলে কামাল আহমেদ, আমাদের সার্বক্ষণিক কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। মঞ্চ বেশ উঁচু করে তৈরি হয়েছিল বলে বেশ দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল কথাটি। যেসব খুঁটির সঙ্গে মাইক বাঁধা হয়েছিল, তার প্রত্যেকটির নিচে দাঁড়ানো ছিল দুজন করে বিএলএফ সদস্য। তাদের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল একটি করে চিরকুট। নির্দেশ ছিল সিরাজুল আলম খান স্লোগান দেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকে তাদের হাতের চিরকুট খুলে নির্দেশ পড়ে নেবে এবং সেই অনুসারে কাজ করবে।

জনসভায় তাজউদ্দীন আহমেদ বক্তৃতা দেবার সময় সিরাজকে পর পর দুই বার বললাম: ‘সিরাজ স্লোগান দে!’ একই কথা পর পর দুই বার বলার কী অর্থ, সেটা জানি শুধু আমি আর সিরাজ। সিরাজ মাইকের দিকে এগিয়ে যেতেই তাজউদ্দীন একটু সরে দাঁড়ালেন। মাইকের কাছে মুখ নিয়ে সিরাজ বললো: প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা দেখছেন উপরে জ্বলজ্বল করছে দুটি শব্দ: ‘জয়বাংলা’। আসুন যার কণ্ঠে যতটুকু জোর আছে, সবটুকু দিয়ে আমরা সমস্বরে বলে উঠি: জয়বাংলা।

প্রতিটি খুঁটির গোড়ায় ইতিমধ্যে খোলা হয়ে গেছে চিরকুট এবং সেখান থেকে লক্ষ কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো গগনবিদারী এই স্লোগান। তাজউদ্দীনের পর আমি বক্তৃতা দিলাম এবং বক্তৃতা শেষ করলাম ‘জয়বাংলা’ বলে। আমি জয়বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষাধিক মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সেই অমর স্লোগান। সেদিন থেকে পরবর্তী এক বছর, ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারি পর্যন্ত অন্যরা শুধু ‘জয়বাংলা’ বললেও আমি ‘জয়বাংলা’র সঙ্গে কখনো কখনো ‘জিয়ে পাকিস্তান’ও বলেছি। এটা ছিল আমার ক্যামুফ্লাজ, স্ট্র্যাটেজি বা যুদ্ধকৌশলের অংশ। কিন্তু ৭ই মার্চের স্লোগানে ব্যাঙাচির লেজ ‘জিয়ে পাকিস্তান’ ঝরে গিয়েছিল, ছিল শুধু ‘জয়বাংলা’। এটাও আমার নিজের সিদ্ধান্ত। স্বাধীনতার পর আবুল মনসুর আহমেদ একবার আমাকে বলেছিলেন, কেউ কেউ নাকি প্রচার করে যে ৭ই মার্চের ভাষণেও আমি ‘জয় বাংলা’র সঙ্গে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ও বলেছি। সেদিন মঞ্চে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের জিগ্যেস করেই তো চক্ষুকণের বিবাদ ভঞ্জন করা যায়।

৭ই মার্চের ভাষণকে যারা বিতর্কিত করতে চায়, তাদেও মধ্যে দুই ধরনের লোক আছে। প্রথম দল, সিরাজ যেমন বলে, পঞ্চম বাহিনীর লোক। এরা আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করতে চায় পরিকল্পিতভাবে। দ্বিতীয় দল ৭ই মার্চের আগের, বিশেষ করে আমার ৩রা জানুয়ারির ভাষণের সঙ্গে ৭ই মার্চের ভাষণ গুলিয়ে ফেলে স্মৃতিবিভ্রমবশত। তাদেরও দোষ দেওয়া যায় না, কারণ ৩রা জানুয়ারির ভাষণ কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং আমি ইচ্ছে করেই সেদিন ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলাম। বলেছিলাম কী, সাংসদের শপথনামার শেষে ‘জয় বাংলা’ এবং ‘জিয়ে পাকিস্তান’ লেখা ছিল।

আগেকার দিনে যুদ্ধে একটি পতাকা ও একটি স্লোগানের প্রয়োজন হতো পক্ষ ও বিপক্ষ সৈনিকদের চেনার জন্য, যেমন মারাঠাদের ‘হর হর ব্যোম, ব্যোম’ কিংবা মুসলমানদের ‘নারায়ে তাকবির’। সৈনিকের পোশাক দেখেও পক্ষ-বিপক্ষ চেনা যেতো। আমাদের যুগে যুদ্ধের ধরণ বদলে গেছে, পতাকার প্রয়োজনও শেষ হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু গেরিলাযুদ্ধ ছিল, সেহেতু পোশাক ব্যবহারে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। বাকি থাকে অপরিহার্য একটি স্লোগান এবং বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামে সেই স্লোগানটি ছিল ‘জয়বাংলা’। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে হাজার বুলেটের চেয়ে শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে এই স্লোগান।

আমি দেখেছি, যারা উপরে উপরে যতই ভাব দেখাক, ভিতরে ভিতরে বাঙালি এবং বাংলাদেশ বিরোধী তারা ‘জয়বাংলা’ স্লোগান সহ্য করতে পারে না। এমন লোকে আওয়ামী লীগ ভরা, অন্ততপক্ষে আমারতো তাই মনে হয়। অনেকে দেখানোর জন্যে মুখে ‘জয়বাংলা’ বলে বটে, কিন্তু মনের ভিতরে স্লোগানটিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। ‘জয়বাংলা’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের লিটমাস পেপার, এ্যাসিড টেস্ট। এই টেস্ট অনেককে দাঁতমুখ খিঁচে সহ্য করে আমাকে ধোঁকা দিয়েছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ধোঁকা দেবে, কিন্তু একদিন না একদিন সত্য প্রকাশিত হয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে যাবেই।

৭০ এর ডাকসু নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। রব-মাখন প্যানেল বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল এই নির্বাচনে। এই নির্বাচনের সময়ই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দুটি বিপরীত ধারা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। গুজব রটে যায়, কিংবা রটানো হয় যে একটি গ্রুপ পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে এবং অন্য গ্রুপটি স্বাধীনতার প্রশ্নে দোদুল্যমান। প্রথম গ্রুপের নেতৃত্বে রব-সাজাহান সিরাজ। নিউক্লিয়াস ও বিএলএফ এরাই চালায়। দ্বিতীয় গ্রুপের নেতৃত্বে শেখ শহীদ আর নূরে আলম সিদ্দিকী। সিরাজের কাছে সব খবর পেতাম। সিরাজরা ভাবতো, অন্ততপক্ষে ডাকসু নির্বাচনে অনেকেই বিশ্বাস করতো, রব-সাজাহান সিরাজ পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে, শেখ শহীদ-নূরে আলম কনফেডারেশনপন্থী।

আওয়ামী লীগের মধ্যেও ছিল এই উপদলীয় বিভক্তি। তাজউদ্দীন একটু বামঘেঁসা। খোন্দকার মোস্তাক সব সময় ডান দিকে ঝুঁকে থাকেন। এই দুই গ্রুপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয় আমাকে। আমি ঠিক ডানপন্থী নই এবং আমার রাজনৈতিক চরিত্র বোঝার জন্যে যে জিনিষটা লক্ষ্য করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে, আমি আর যাই হই, কমিউনিস্ট নই, কোনোদিনই হতে পারবো না।
(ক্রমশঃ)
লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।