সজিব খান, ঢাকা: রাজনৈতিক দলগুলোর ভাঙা-গড়ার খেলায় সম্প্রতি যোগ হয়েছে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর কেনো হুট করে দলের সিনিয়র নেতারা দুই ভাগে বিভক্ত হলো- এ নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ তিন নেতার নেতৃত্বাধীন একাংশ বর্ধিত সভা করে আগামী ২৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করে। এরমধ্যে দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে দুই খণ্ড হয় গণফোরাম। এর ফলে এখন দলটির একাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন ড. কামাল হোসেন ও ড. রেজা কিবরিয়া। নতুন অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সাবেক নির্বাহী সভাপতি আবু সাইয়িদ এবং সুব্রত চৌধুরী।

মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ড. রেজা কিবরিয়া দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়ার পর উনারা চারজনকে বহিষ্কার করেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। আমিসহ গণফোরামের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ড. কামাল হোসেনের কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলাম যাতে এসব বহিষ্কার বন্ধ করে সবাইকে মিলেমিশে চলতে বলা হয়। কিন্তু উনি এসবের কিছুই করেননি, বরং উনারা সেন্ট্রাল কমিটির কোনো মিটিং না ডেকে, দলীয় গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে আমি যেই কমিটিতে মেম্বার ছিলাম সেটা ভেঙে নতুন একটা আহ্বায়ক কমিটি করলেন। যা থেকে থেকে সুব্রতরা বাদ পড়েন। কোন এখতিয়ারে এটা করলেন। এটা কি বৈধ না অবৈধ।

একই ধরনের অভিযোগ করেন দলের সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।

তিনি বলেন, ড. রেজা কিবরিয়া গত ১৮ মাসে একদিনও অফিস করেননি। দলীয় গঠনতন্ত্র না মেনে নিজের ইচ্ছামতো বাড়িতে বসে দল পরিচালনা করছিলেন। নিজের পছন্দের লোকদের প্রেসিডিয়াম মেম্বার করছিলেন, আর ড. কামাল সেসব অনুমোদন করছিলেন। এসব স্বেচ্ছাচারীতা ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কাজের কারণে আমরা আর একসঙ্গে থাকতে পারছি না। আমরা বেশকয়েকবার সমঝোতার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। ড. কামাল হোসেন সকালে এক কথা, বিকেলে আরেক কথা বলেন। উনার স্মৃতিভ্রম হয়েছে। উনাকে তারা ভুল পথে পরিচালিত করছেন। আগামী ২৬ ডিসেম্বর আমরা কাউন্সিল করছি। যদি ড. কামাল হোসেন তাদের কাছ থেকে মুক্ত হয়, তাহলে আমরা তাকে নিয়ে গণফোরাম করবো।

তবে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া দাবি করছেন দলীয় গঠনতন্ত্র মেনেই দল পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেকোনো গুরুত্বর্পূণ সিদ্ধান্ত সিনিয়র নেতারা বসে মিটিং করে তারপর নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, মন্টু সাহেবরা এতো বছর দলের জন্য কি করেছেন তা সবাই জানে। তিনি আরেকটা দল ঘুরে তারপর আবার ফিরেছেন। করোনার মহামারির মধ্যে সেন্ট্রাল কমিটির মিটিং ডাকার অবস্থা ছিলো না। তবে কমিটি ভাঙার আগে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতারা একসঙ্গে বসেছিলাম। সেখানে মন্টু সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। মিটিংয়ে একজন সিনিয়র নেতার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কমিটি ভাঙা হয়। তার প্রস্তাবে কেউ আপত্তি করেননি। কারণ ওই কমিটি গঠনের ব্যাপারে অনেক অনিয়ম ছিলো। তারপরও ড. কামাল জানতে চেয়েছিলেন কারো কিছু বলার আছে কিনা। তিনি (মোস্তফা মহসিন মন্টু) তখন কিছু বললেন না, আমতা আমতা করে চুপ করে থাকলেন। এখন পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ একটা বিষয় নিয়ে জেগে উঠলেন। এভাবে তো দল চলতে পারে না।

ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, আমি মনে করি হতাশা থেকে তারা দল ছেড়ে চলে গেছেন। তারা গত ২৬ বছরে দলের জন্য কিছু করতে পারেনি- এ নিয়ে জেলার নেতারা উদ্বিগ্ন। এছাড়া নির্বাচনের সময় অনেক গাফিলতি হয়েছে। যার ফলে তাদের উপর কেউ ভরসা রাখতে পারছেন না। এ কারণে তারা কোনো কাজ না করে পদ ধরে রাখতে চাচ্ছিলেন। তারা এখন যা করছে দেশের রাজনীতিতে বা দলে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের বর্ধিত সভা-কাউন্সিল এসব কর্মসূচির সঙ্গে গণফোরামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের সভায় যেসব লোক এসেছে বেশিরভাগই বাইরের লোক। রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এমন লোকও ধরে নিয়ে এসেছে। আর তারা যে সংখ্যক উপস্থিতির কথা বলছেন অতো লোক প্রোগ্রামে যাননি।

গণফোরাম ভাঙনের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, মোস্তফা মহসিন মন্টুর পর সুব্রত চৌধুরী এবং আবু সাইয়িদ দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ড. কামাল রেজা কিবরিয়াকে খুব বেশি পছন্দ করায় তাকে দায়িত্ব দেন। এরপর থেকেই তারা রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্ব মেনে কাজ করতে চান না। এরপর যখন দলের চারজন কেন্দ্রীয় নেতাকে বহিষ্কার করা হয় তখন সমস্যা আরও বাড়ে। এখন দলে যে ভাঙন দেখা দিয়েছে তা মূলত পদ-পদবির জন্যই হচ্ছে। তবে এসব করে কোনো লাভ হবে না। ড. কামাল যেখানে থাকবে সেটাই গণফোরাম।

এর আগে গত ৪ মার্চ গণফোরোমের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি এবং ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১২ মার্চ দলের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যা থেকে বাদ পড়েন দলটির সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ অন্তত হাফডজন সিনিয়র নেতা।