হাসান হামিদ : রাত এগারোটা বাজে। বেইলি রোডে আমি আর রুনা ঘুরছি, ঈদের আগের রাত। বন্যার পানির মতো হু হু করা মানুষের ভিড়। এই ভিড় ঠেলে আমরা নিয়েছি কিছু টাওয়েল, মিনি সাইজের কাঁথা, বালিশ এসব। কয়েক সপ্তাহ পর প্রথম বাবা হব, এমন দুর্দান্ত অনুভূতি আমার ভেতরে।

আশেপাশের সবকিছু কচি লেবুপাতা রঙের মতো কোমল মনে হচ্ছিল আমার কাছে। অনাগত রাজকন্যার কী নাম হতে পারে তা ভেবে মাসখানেক না ঘুমানো ফোলা চোখ নিয়ে স্বপ্নময় এক অপেক্ষা চলছে তখন। বাসায় ফিরতে সে রাতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।

বাসায় প্রতি রাতে আমি কিছু না কিছু লিখি। সেদিনও কিছু লিখতে চেষ্টা করলাম। লেখা একেবারেই হচ্ছিল না। আমার অনাগত সন্তানের মুখ চোখের সামনে বারবার ভাসছিল। ভাবলাম আমার অনাগত মেয়ের কাছে একটা চিঠি লেখা যায়। কিন্তু সেই চিঠির উপযুক্ত কোনো শব্দ আমি আর খুঁজে পাই না। কোনো শব্দই আমার যথার্থ মনে হচ্ছিল না।

আমার মেয়েকে সম্বোধনের যোগ্যতম শব্দের খোঁজে রাত তিনটা বাজিয়ে ফেললাম। কিন্তু এক লাইনও লেখা হলো না। আসলে সেই অনুভূতির কাছে পৃথিবীর অন্য যে কোনো সৃষ্টি তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। আরও একটি কারণ ছিল। ভাবনার ভেতরে উঁকি মারছিল আরও একটি মুখ; আমার মায়ের। ঈদে এই প্রথম বাড়ি যাচ্ছি না। আম্মার জন্য মন খারাপ লাগছিল। দুইয়ে মিলে আনন্দ বেদনার এক মিশেল অনুভূতি আমার মাঝে। তারপর কখন ঘুমিয়েছি টের পাইনি।

সকালে ঘুম ভাঙল রুনার ডাকে। রুনাকে বিষণ্ন দেখে আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। আমার সকালে গোসল সেরে জাতীয় ঈদগাহ, বঙ্গভবন এবং তারপর মিরপুর যাবার কথা। রুনা বলল, একটু সমস্যা হচ্ছে। ডাক্তারকে ফোন করতে হবে। আমি যতদূর জানি, রুনা খুব নরম স্বভাবের মেয়ে। সাধারণ নাটকের নায়িকার কান্নার সিন দেখেও সে অঝোর কাঁদতে পারে।

আমি তখনই ডাক্তারকে ফোন দিলাম। ডাক্তারের ফোন বন্ধ। রুনা যে দুজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধায়নে এতদিন চিকিৎসা নিয়েছে তারা একজন স্কয়ার হাসপাতালের, আরেকজন বারডেমের। দুজনই অসম্ভব ভালো মানুষ। একজন অবশ্য কথায় কথায় রুনাকে ধমকাতেন। সেই আন্টির ভালোবাসার ধরনই সম্ভবত ধমক। এ জগতে ভালোবাসার ভাষা বড় বিচিত্র। একে ব্যাখ্যা করা যায় না।

দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে বারডেমের ডাক্তারকে পাওয়া গেল। তিনি এই মুহূর্তে গ্রামের বাড়িতে আছেন। ঈদ করতে গেছেন। সব শুনে আমাকে কোনো চিন্তা না করতে বললেন। আর সেই সাথে বললেন, আমরা যেন এখনই হাসপাতালে চলে যাই।

ঈদের দিন। সব রাস্তাঘাট ফাঁকা। খুব দ্রুতই সেগুনবাগিচায় বারডেমের মা ও শিশুদের যে নতুন ইউনিট সেখানে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে বুঝতে পারলাম, আমি পৌঁছার আগেই ডাক্তার সেখানে ফোন দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। ইমারজেন্সিতে একজন ইন্টার্নি ডাক্তার ছাড়া আর কেউ নেই।

ঈদের দিন সকাল হওয়াতে আর কাউকেই তখন সেখানে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি আবার ডাক্তারকে ফোন দিলাম। রুনার সাথে কথা বলে উনি জানালেন, আজকেই অপারেশন করতে হবে এবং বেবি প্রিম্যাচিউর হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর অপারেশন নির্ধারিত তারিখের চার সপ্তাহ আগে হচ্ছে। সেজন্য বেবিকে এনআইসিওতে কিছুদিন রাখতে হবে।

ডাক্তার বললেন, তিনি গ্রামের বাড়ি না থাকলে সমস্যা ছিল না। আর এখন রওয়ানা দিলেও তার আসতে মধ্যরাত হবে। এত দেরি করা যাবে না। আবার হাসপাতালে কোনো এনআইসিইউ খালি নেই। তবে উনি নিজেই কয়েক জায়গায় ফোন দিয়ে আমাকে আবার জানাচ্ছেন বলে ফোন রাখলেন। মিনিট সাতেক পর উনি জানালেন। আমার এই সাত মিনিটকে সাত বছর মনে হলো। এই সাত মিনিটে আমি সাতশ বার রুনাকে জিজ্ঞেস করেছি, ওর খুব খারাপ লাগছে কিনা! সে আমার বিমর্ষ অবস্থা দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

আমি এর মধ্যে আলী ভাইকে ফোন দিয়েছি। আলী ভাই হলেন আমার সব বিষয়ের সমাধানকারী দুলাভাই। আমার ঠাণ্ডা, গরম, বৃষ্টি, বাদল সব অনুভূতি এই ঢাকা শহরে যাকে সবার আগে জানাই তিনিই হলেন আলী ভাই। আলী ভাইয়ের বড় বোন কোহিনূর আপা। আপা হলেন অসাধারণ একজন মানুষ। পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মায়, যাদের কাজকর্ম দেখলে মনে হয়, অন্য সবাইকে ভালোবাসবার বিশাল এক দায়িত্ব নিয়ে তারা এসেছেন। আপা হলেন এই দলের।

আপার পরামর্শে বিকেল চারটায় রুনাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ডাক্তার এবং হাসপাতালের মালিক ছিলেন আপার এক বান্ধবী। সদলবলে তখনই ডাক্তার এলেন। রুনা অপারেশন থিয়েটারে। আমরা চারজন ওটির বাইরে সোফায় বসা। চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স আসলেন। বাচ্চা কোলে। এসে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলের বাবা কে?

আমরা চুপচাপ। উনি আবার বললেন, ছেলের বাবা কে? আলী ভাই আমাকে বললেন, কী মিয়া, যাও না কেন? আমি আস্তে করে বললাম, আমার মেয়ে হবে জানতাম। এটা অন্য কারো বেবি হতে পারে।

তখনই মনে হলো, আজ ঈদের দিন এবং হাসপাতালের ওটিতে রুনারই কেবল অপারেশন হয়েছে। গত কয়েক মাস মেয়ের বাবা হচ্ছি এমন অনুভূতি লালন করা আমি আমার ছেলেকে কোলে নিলাম।

ডাক্তার হাসলেন এবং বললেন, আপনার ছেলে তো এডাল্ট। সে সময় মতোই পৃথিবীতে এসেছে। আগের ডাক্তার ভুলভাল বলেছেন।

রুনার সাথে তার প্রথম মা হওয়ার সমস্ত রাতটি জেগে কাটিয়েছেন কোহিনূর আপা। আমার ছেলে এই পৃথিবীতে এসে প্রথম রাতটি কাটিয়েছে আপার কোলে। আপাকে একটা কথা কখনো বলা হয়নি। আজ বলি। আপা, আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ। যেগুলো কোনোদিন শোধ করা যাবে না। শোধ করতেও চাই না। কিছু ঋণ ভালোবাসার শীতল জলে ভেজানো থাকে। জিওল মাছের মতো মাঝে মাঝে সেই ঋণ নড়ে ওঠে। আর আমি টের পাই তাতে জমে থাকা ভালোবাসাটিরে। তখন মনে হয়, কী আশ্চর্য চমৎকার এই পৃথিবী এবং আমাদের বেঁচে থাকা!

লেখক: তরুণ কলামিস্ট