বরিশালের বিস্ময় বালক বিএম কলেজের বাংলার অধ্যাপক কমরেড রফিকুল ইসলাম স্যারের তৃতীয় ছেলে বরিশাল মুসলিম গোরস্থান রোডের জাহিদুল ইসলাম মাহমুদ(জামি) এর জন্ম ১জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে। জামির লেখাপড়া শুরু হয় বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন পাঠশালায়। ৩য় শ্রেণি থেকে ৬৫ সালে বরিশাল ত্যাগ পর্যন্ত বিএম স্কুলে পড়শোনা চলে তার। তিনি ঢাকার সেগুন বাগিচা স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের স্বকীয়তা, ভাষা ও কৃষ্টিকে ধ্বংস করার দুরভিসন্ধি নিয়ে ঘোষণা করেছিল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল বাঙালি ছাত্রজনতা। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে গড়ে ওঠে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, এক নদী রক্তের বিনিময়ে আসে আমাদের স্বাধীনতা।
বরিশালের সন্তান গেরিলাযোদ্ধা জামির নেতৃত্বে ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা শহরের পুরানা পল্টনে গড়ে ওঠে দুর্ধর্ষ এক গেরিলা বাহিনী |

১৯৭১ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ ঘটিকায় জামি নিজে ৬ জন গেরিলা যোদ্ধা নিয়ে কার্জন হলের পূর্বপাশে অবস্থিত BNR ভবন (Bureau of National Reconstitution যেখানে হাসানুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে আরবি হরফে বাংলা লেখার মূল কাজটি হতো) এ প্রবেশ করে বেশকিছু পেট্রল ও দেশি বোমা চার্জ করেন। ৮টি বোমা বিস্ফোরিত হলে ভবনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। অপারেশনে গেরিলা “খান” আহত হন। গেরিলা নেতা জামি নিজেই প্রকাশ্য দিবালোকে রিক্সা-স্কুটারে করে ক্যামোফ্লেজ করে রক্তাক্ত খানকে হলিফ্যমিলি হাসপাতালে রেখে আসেন। পরে গেরিলা খান পাকিস্তানি পুলিশের হাতে ধরা পরে জেলে নিক্ষিপ্ত হন। ১৯৭১ এর অস্থির সময়ে ঢাকা তথা পূর্বপাকিস্তানে এটিই ছিলো পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ১ম গেরিলা আক্রমণ।

১৯৭১ সালের ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান সংসদ বাতিল এর ঘোষণা দিয়েছিল। সেদিন রাতেই জামি ও নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুসহ কয়েকজন গেরিলা মিলে সচিবালয়ে বোমা চার্জ করে একস্টেনশন ভবনের ছাদ গুড়িয়ে দেয়।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেডিওতে বংগবন্ধুর ভাষণ প্রচার না করায় সেদিনই সন্ধ্যায় এমরানের জীপে করে জামি ও আলী আফসার রেডিও স্টেশনের ভেতরে বোমা ছুড়লে তা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বারবার ঢাকা কাপিয়ে দেয় পল্টনের এই গেরিলা বাহিনী।

১৯৭১ সালের ২৭ শে মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে ইতিপূর্বে সংগৃহীত ৮টি রাইফেল ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ৪টি বন্দুক নিয়ে জামি, শহীদ মানিক, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, আলী আফসার, নাট্যশিল্পী আসাদ, টুনিসহ গেরিলা গ্রুপটি বুড়িগংগার ওপারে কোনাখোলায় ক্যাম্প স্থাপন করে। ১লা এপ্রিল নীচে গানবোট নিয়ে এবং আকাশ থেকে এয়াররেইড করে পাকিস্তান আর্মী জামিদের ক্যাম্প এটাক করে। পাকী আর্মিদের প্রবল আক্রমণে জামিদের গ্রুপ টিকতে না পারলে তাদের কিছু গেরিলাকে অস্ত্র সহ কলাতিয়া বাজারে রেখে মাত্র ৮টি বন্দুক নিয়ে গভীররাতে কার্ফুর মধ্যে ঢাকা ফেরে।

ঢাকা ফিরেই এই গেরিলা বাহিনী আত্মগোপনে থেকে পুনরায় দল গোছাতে থাকে। ১৯৭১ সালের মে মাসে নুতনভাবে সংগঠিত হয়ে জামি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ছেলে মিতু, আলী আফসার, টুনি প্রমুখ বঙ্গভবনের ভেতরে হাতবোমা ছুড়ে ঢাকা শহরে বিরাট প্যানিক সৃষ্টি করে।

এমনকি আজিমপুরে অবস্থিত পাক আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে জামি, আলী আফসার, আজিমপুরের সাচ্চু, সজিব এক্সপ্লোসিভ চার্জ করে এবং সাকসেসফুলি অপারেশন শেষ করে গেরিলারা নিরাপদ গন্ত্যব্যে ফিরে আসে।
২৪ মে শান্তিকমিটির মিছিলে জামি ও তার বাহিনীর কয়েকজন মিলে গাড়িতে চড়ে গিয়ে বোমা চার্জ করে। সেই অপারেশনে গাড়ির ড্রাইভার মালেক পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পরে। কিন্তু জামিসহ বাকি কজন নিজেরা নিজেদের রেসকিউ করে আর্মির চোখে ধুলো দিয়ে পালতে সক্ষম হয়। কিন্তু জামিসহ অধিকাংশ গেরিলার পরিচয় ফাস হয়ে যায়। ফলে জামী ও তার দল আত্মগোপনে চলে যায় |

আত্মগোপনে থেকেই ২৫ মে বরিশাল ডগলাস বোর্ডিং সংলগ্ন বগুড়া রোডের বাবুল-এর পিতার (আনসারের কর্মকর্তা) অফিসিয়াল পিস্তল গেরিলা যুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য আনতে বাবুলকে সংগে করে খিলগাঁও সরকারি কোয়ার্টারের গেট দিয়ে ঢোকার সাথে সাথে আর্মির হাতে প্রায় ধরা পড়া কালে বাবুল দৌড়ে পালায়। আর্মি এলএমজি দিয়ে ফায়ার করে আর এমরান বন্দুক দিয়ে পাল্টা গুলি করে। এক পর্যায়ে জামি পাক আর্মির হাতে ধরা পড়ে। পুরো এলাকা লক ডাউন করে তল্লাশি চালিয়ে অসংখ বাঙালিকে গ্রেফতার করা হয়। জামির অবস্থানের কাছাকাছি একটি মেস থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করে। সেদিনের মত এমরান পালাতে সক্ষম হলেও পরে সেও ধরা পরে যায়।

পাক আর্মির হাতে বন্দী গেরিলা জামিকে তার সঙ্গীদের সন্ধান দিতে অমানবিক টর্চার করা হয়। সেগুনবাগিচায় মিলিটারি ক্যাম্পে ( মিউজিক কলেজ উপরে বারীন দত্তের ফাকা বাসা) ৫ দিন অবর্ননীয় টর্চারের পর জামিসহ ৬ জনকে তারা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ১৪ তম ডিভিশন আর্মি হেড কোয়ার্টার এ (11th Engineering quarter guard -এর) পাক আর্মির প্রশিক্ষিত অফিসার কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের নামে অবর্ননীয় শারীরিক অত্যাচার চালাতে থাকে।

একদিন সকালে জামিসহ ৬ জনকে জয়দেবপুর রাজবাড়িতে 2nd Bengal regiment এর বন্দী শিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে জামিরা ছাত্র, কৃষক, গুলিবৃদ্ধ আনসার, ট্যাংক বাহিনীতে কর্মরত ১ প্লাটুন বাঙালি সেনাকে দেখতে পায়। বিরামহীন নির্যাতন সয়ে থাকা আর মৃত্যুর প্রহর গুনে সময় কাটানোই ছিল বন্দীদের একমাত্র কাজ। নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে জামিদের উপস্থিতিতেই নবাবপুর স্কুলের নির্মল স্যার পাগল হয়ে যান।

সেখানে জামিসহ বন্দি ৩০ জনের বিচার শুরু হয়। বিচার শেষে জামিদের জেলে পাঠানো হয়। জেলে জামির সাথে দেখা হয় মীরপুরের মুক্তিযোদ্ধা খালেক, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ইকবাল আহমেদ, আগরতলা মামলার আসামি শামসুল হক, ২৫ শে মার্চ বংগবন্ধুর বাড়ি থেকে ধরে আনা হাজী মোর্শেদ, হামিদুল হক চৌধুরির নাতি আরিফুর ইসলামসহ অসংখ্য দেশপ্রেমিকের।

ইয়াহিয়া খানের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার অভিনব কৌশলের ফলশ্রুতিতে ২৫ অক্টোবর জেল থেকে বেশকিছু বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে গেরিলাযোদ্ধা জামিও বন্দীদশা থেকে শর্তযুক্ত মুক্তি পান। শর্ত ছিল সপ্তাহের একদিন আর্মি হেড কোয়ার্টারে হাজিরা দিতে হবে। জেল থেকে বেড়িয়েই জামি তার গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সাভার ক্যাম্প থেকে সহযোদ্ধা আলতাফ, টুনি ঢাকায় এসে জামিকে সাভার ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

১৪ নভেম্বর ঢাকা- মানিকগঞ্জ ব্রীজ উড়াতে গিয়ে জামিদের কোম্পানি কমান্ডার পুরানা পল্টনের রেজাউল করিম মানিক বীরবিক্রম শহীদ হন। নাসির উদদীন ইউসুফ বাচ্চু ঢাকা নর্থ কোম্পানি কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহন করেন। নাসির উদ্দীন বাচ্চুর নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় প্রায় প্রতিদিন রাতে সাভার-ধামরাই রুটে পাক আর্মির গাড়ি বহরে যোদ্ধারা অতর্কিত আক্রমণ চালাতে থাকেন। ১২ ডিসেম্বর সাভার থানাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, কোম্পানি কমান্ডার নাসিরউদ্দিন বাচ্চুর নেতৃত্বে জিরাবোতে জামিদের দল এম্বুস করে। পাক আর্মির সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ হয় সারাদিন। কমান্ডার নাসিরউদ্দিন বাচ্চুর রণকৌশল ও নির্দেশনায় কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। চতুর্মুখি আক্রমণে পাকবাহিনী পরাস্ত হয়। সেই যুদ্ধে অসংখ্য পাকসেনা আহত ও নিহত হয়। সেদিন মানিকগঞ্জের ৯ম শ্রেনীর ছাত্র ছোট্ট টিটো সাহসের সাথে যুদ্ধ করে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন| সেই টিটোর মুখ আজো জামিকে তাড়িত করে। এই যুদ্ধে বেশকিছু পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করে এবং একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন যুদ্ধশেষে আত্মহত্যা করে।

বরিশাল মুসলিম গোরস্থান রোডের ১৭ বছর বয়সী সেই জামিই ছিল ৭১-এর রণাঙ্গণের বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এক অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধুর জৈষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সাথে ঘনিষ্ঠতার ফলশ্রুতিতে তার সরাসরি নির্দেশনায় জামি ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি তৎকালীন ঢাকা শান্তিনগর ক্লাবের নির্বাচিত সহসম্পাদক ছিলেন।

১৯৭৯ সালে দেশ ছেড়ে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা জামি মাস্টার্স ইন পলিটিকাল সাইন্স, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি, বোস্টন এ- ভতি হয়েও দুর্ভাগ্যজনকভাবে কর্মযুদ্ধে জড়িয়ে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারেন নাই। অগত্যা তিনি লস এঞ্জেলেসে চলে আসেন ১৯৮১ সালে।

আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে বাঙালী কমিউনিটির বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জামি’র ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। তার নেতৃত্বেই ৮০-৯০ দশকে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব লসএঞ্জেলেস প্রবাসীদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। লস এঞ্জেলেসে নবাগত বাঙালিদের সেবা প্রদানের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো পালনে প্রবাসীরা এগিয়ে আসে। বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহিদুল মাহমুদ জামি ১৯৮৪-১৯৯০ অব্দি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব লসএঞ্জেলেসের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯১–১৯৯২ অব্দি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব লসএঞ্জেলেসের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সংগঠনে পরামর্শক ও সংগঠকের দায়িত্ব পালন করে কমিউনিটি গঠনে অবদান রেখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
–প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক, লসএঞ্জেলেস-এর “বাংলা পাঠশালা”, “কমিউনিটি সেন্টার” এবং “ফ্রিডম ফাইটার্স অব বাংলাদেশ ইন ক্যালিফোর্নিয়া”|
–ভাইস চ্যান্সেলর বাংলাদেশ বিজয় বহর |
–উপদেষ্টা “অরেঞ্জ কাউন্টি এসোসিয়েশন” ও “ঘুড়ি উৎসব”|
–উপদেষ্টা ক্যালিফোর্নিয়া আওয়ামী লীগ।

( যুদ্ধকালীন ছবিশিল্পীঃ- প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধকালীন জামির সহযোদ্ধা |যুদ্ধোত্তর বহু পুরস্কারে ভূষিত এদেশের প্রখ্যাত ফটোশিল্পী/ ফটোযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপনের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা)

লেখক: নোমান রশিদ