রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মৃত্যুসংবাদটি ফেসবুকে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে মানুষটি স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করলেন, সে মানুষটির কথা আমরা অনেকেই মনে রাখিনি। লোকচক্ষুর অন্তরালেই তিনি এত দিন ছিলেন ‘জীবন্ত ইতিহাস’ হয়ে।

তাঁর মৃত্যুর খবর সব টিভি ট্যানেল প্রচার করেনি। পরদিনের পত্রিকায় এল ছোট্ট করে, ছাপা হলো শোক সংবাদ কলামে। লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হককে টেলিফোন করলাম। তিনি বললেন, একাত্তরে অসীম সাহসী ভূমিকা নেওয়া মুজিবুর রহমান জয়পুরহাটে নিজ বাড়িতে সোমবার ভোররাতে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। মফিদুল হক তাঁকে নিয়ে ‘কান পেতে রই’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মুজিবুর রহমান যেভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিলেন, এই বাংলাদেশে তার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই।
মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন নাজিম মাহমুদ তাঁর ‘যখন কৃতদাস: স্মৃতি৭১’ বইয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের সেই অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা মনে করলে এখনো গা শিউরে ওঠে। মাসের পর মাস তাঁর ওপর নৃশংসতা চলেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বেই মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে দেন, সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। সেনা ক্যাম্প সরানো এবং তাদের গণহত্যা-নির্যাতন বন্ধ না হলে তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন না। সেই সঙ্গে তিনি নিজের নামটি বদলে রাখলেন ‘দেবদাস’।

একাত্তরে নাজিম মাহমুদ ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। পরে কর্তৃপক্ষের চরমপত্র পেয়ে আরও অনেকের সঙ্গে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীও তিনি।

একাত্তর সালের ২৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। চিঠির বক্তব্য ছিল এ রকম:

‘ক্যাম্পাসে সেনা ক্যাম্প বসিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা হানি করা হয়েছে। এ জন্য আমি ক্যাম্পাস ত্যাগ করছি। অমি তখনই ক্যাম্পাসে ফিরে আসব যখন সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও পবিত্রতা পুনরুদ্ধার করা হবে এবং সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আমি আশা করি, নিচে উল্লিখিত ঠিকানায় আমাকে পরিস্থিতি জানানো হবে। আমি আরও আশা করি, এই দুর্যোগে, গণহত্যা, স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলো সেখানে কাটাব।’

তিনি এই চিঠিতে কর্তৃপক্ষকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে এখন থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যেন ‘দেবদাস’ নামটিই ব্যবহার করা হয়।

মুজিবুর রহমান এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন। পাকিস্তানিদের দালাল এই শিক্ষাবিদ কেবল ক্যাম্পাসে সেনা ক্যাম্প স্থাপনের অনুমতিই দেননি, তাদের অপকর্ম যাতে কেউ প্রকাশ না করে, সে জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের সতর্কও করে দিয়েছিলেন। ফলে ধারণা করা যায়, তাঁর সম্মতিতেই বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বরাবর লেখা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের চিঠিটি ত্বরিত সেনা দপ্তরে চলে যায়।

নাজিম মাহমুদের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি, মুজিবুর রহমান তখন ক্যাম্পাসের পূর্ব পাড়ার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ ইবনে আহমদ সেই বাসা চিনিয়ে দেওয়ার জন্য পাাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যান এবং বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসেন।

নাজিম মাহমুদ লিখেছেন, ইবনে আহমদ সাহেবকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসন ভবনে গাড়িটি দাঁড়াল কিছুক্ষণ। গেটের পাশেই আমার দপ্তর। প্রায় দৌড়ে বেরোলাম সেই অধ্যাপককে একনজর দেখার উদ্দেশ্যে, যিনি আমাদের মনের জ্বালাটি প্রকাশ করেছেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তাই সেই মুহূর্তের একমাত্র ভাবনা, হয়তো এমন একটি সত্যিকারের মানুষকে কোনো দিন আর দেখতে পাব না।

এর আগের ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে:
চিরকুমার অধ্যাপক মুজিবুর রহমান একাই ছিলেন শূন্য ফ্লাটে। ক্যাপ্টেন প্রশ্ন করলেন: আপনার নাম কী?
‘দেবদাস’—নির্বিকার উত্তর।
চিঠির সূত্র ধরে ক্যাপ্টেনের দ্বিতীয় প্রশ্ন: গণহত্যা বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
অধ্যাপকের সাফ জবাব: এই দিনগুলোতে তোমরা যা করছ।
এরপর ক্যাপ্টেন বললেন, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’
অধ্যাপক উত্তরে বললেন, ‘আমাকে আগে দুপুরের খাবার খেতে দাও। আমি এখন রান্না করছি।’
কিন্তু ক্যাপ্টেন তাঁকে সেই সময় দিলেন না। বললেন, ‘আমি তোমার জন্য আরও ভালো খাবারের ব্যবস্থা করব।’

এরপর পাকিস্তানি সেনারা এমন ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে, মুজিবুর রহমানকে যার চিহ্ন বহন করতে হয়েছে সারা জীবন। প্রথমে রাজশাহী বিশ্বিবদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্থাপিত সেনা ক্যাম্পে আটকে রেখে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তাঁকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়, লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। পরে রাজশাহী থেকে পাবনা নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। পাবনা থেকে নেওয়া হয় নাটোরে। সেখানে নির্মম নির্যাতন চলে তাঁর ওপর।

নির্যাতনের এক পর্যায়ে মুজিবুর রহমান মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ৫ সেপ্টেম্বর নির্যাতন শিবির থেকে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি জয়পুরহাটে নিজের বাড়িতে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের বাকি সময়টা বাড়িতেই ছিলেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত। তবে তাঁর চেতনা ছিল।
ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হয়। ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। তিনি কথা রেখেছিলেন, যত দিন সেনা ক্যাম্প ছিল, তত দিন তিনি ক্যাম্পাসে আসেননি। তাঁর থাকার জায়গা হয় জুবেরি হাউসে। কিন্তু তিনি কাজে যোগ দেননি তখনো।

১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর রহমান আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে ঘোষণা করেন, আজ থেকে আমার নাম ‘দেবদাস’। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন তাঁকে যেন দেবদাস নামে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫২তম সিন্ডিকেট সভায় তাঁর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদনও পায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে তাঁর কাছে কোনো চিঠি দেওয়া হয় না। বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে উপেক্ষা করে।

এ অবস্থায় মুজিবুর রহমান ওরফে দেবদাস ১৯৭৩ সালের ৫ মে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং জানিয়ে দেন, তাঁর পদত্যাগ ১৯৭১ সালের ৬ আগস্ট থেকে যেন কার্যকর করা হয়। ৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ব্যাংক হিসাবে (সাবেক হাবিব ব্যাংক, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক) অনেক টাকা জমা ছিল। নাম পরিবর্তন করার কারণে সেই টাকাও তুলতে পারেননি মুজিবুর রহমান।

মুজিবুর রহমানের প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ আচরণ ছিল অমার্জনীয়। একাত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালি করেছেন, তাঁদের মধ্যে খুব কমই শাস্তি পেয়েছেন বা চাকরি হারিয়েছেন। অনেকে ভোল পাল্টে নব্য আওয়ামী লীগার হয়ে ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। আবার পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানিদের সহযোগী এম এ বারিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলনও করেছিলেন।

আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদকারী মুজিবুর রহমানকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে। অজুহাত দেখানো হয়েছে, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন। মুজিবুর রহমান যদি অসুস্থও হয়ে থাকেন, সেটি হয়েছেন পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের কারণে। তাঁকে সুস্থ করার, তাঁকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করেনি।

লেখক সুব্রত শুভ লিখেছেন, স্বাধীনতার পর কিছু দিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জুবেরি হাউসে অবস্থানের সুযোগ পান। এরপর একদিন কৌশলে তাঁকে সেখান থেকে পাঠানো হলো হেমায়েতপুর মানসিক হাসপাতালে। সেখানে তাঁর চিকিৎসার কোনো পরিকল্পনাই কারও ছিল না। আসলে একজন প্রতিবাদী দেবদাসকে গ্রহণ করার জন্য যে ঔদার্যের প্রয়োজন, সেটি আমাদের বৌদ্ধিক সমাজ বা রাষ্ট্র অর্জন করতে পারেনি। এ কারণেই মুজিবুর রহমান ৪৮ বছর ধরে মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাঁদের দোসর আলবদর-রাজাকারদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ করেছি। প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে। কিন্তু মুজিবুর রহমানের মতো যাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জীবন্ত শহীদ হয়েছেন, যাঁরা ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিলেন, তাঁদের কি আমরা মনে রেখেছি? তাঁদের নামে কি আমরা কোনো স্থাপনা করেছি? আমরা স্মরণ করতে পারি, ঢাকায় শহীদ আজাদের মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভাত খাননি। কেননা, পাকিস্তানিদের হাতে আটক আজাদ মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছিলেন। মা যেদিন ভাত নিয়ে গেছেন, দেখেন আজাদ নেই। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে হত্যা করেছে। আজাদের আত্মদান নিয়ে আনিসুল হক মা নামে সাড়া জাগানো উপন্যাস লিখেছেন। মুজিবুর রহমানকে নিয়ে মফিদুল হক ‘কান পেতে রই’ নামে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন (এটা ইউটিউবে দেখা যায়)। সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া গল্প লিখেছেন।

বাংলাদেশের এ রকম আরও অনেক আজাদ ও দেবদাস ছিলেন, যাঁদের কথা আমরা জানি না। রাষ্ট্র তাদের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯৩০ সালে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯৪৬ সালে স্থানীয় খঞ্জনপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করার পর বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে মেধাতালিকায় নিজের জায়গা করে নেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে দ্বিতীয়বার এমএসসি করেন। ১৯৬৭ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন।
রাষ্ট্র বিলম্বে হলেও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে মুজিবুর রহমান ওরফে দেবদাসকে একুশে পদক দিয়ে ঋণ শোধের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের কর্তৃপক্ষ তাঁর পাপস্খলন করবে কীভাবে?

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com
লেখাটি প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত।