পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজের সৌজন্যে: ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। আওয়ামী লীগ সভাপতির প্রয়াত এই রাজনৈতিক উপদেষ্টার পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া গণফোরাম যোগ দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে ভোটের লড়াই ছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনের বড় চমক। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভোটযুদ্ধে জয়ী হতে না পারলেও এই অর্থনীতিবিদ পরবর্তীতে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান। আওয়ামী লীগে যোগ না দেওয়ার কারণ, দলটির আদর্শ বিচ্যুতি এবং নিজ দল গণফোরামের গন্তব্য নিয়ে পূর্বপশ্চিমের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ড. রেজা কিবরিয়া। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সজিব খান

[এটি সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় কিস্তি]

সম্প্রতি আপনি সিলেট চারদিনের সাংগঠিনক সফর করে আসলেন, তার আগে লন্ডনে একটা লম্বা সফরে ছিলেন। কেমন হলো আপনার সফর?

সেখানে আমাদের দলের কিছু সাংগঠনিক কাজ করলাম। লন্ডন, কার্ডিফ, লেস্টার সিটি, নিউ ক্যাসেল, ম্যানচেস্টার, ওল্ডহ্যাম, সাউথাম্পটনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিটিং করলাম আমাদের সমর্থকদের সঙ্গে। কিছু কমিটির ব্যাপারেও আলোচনা করলাম। তারপরে আমার অক্সফোর্ডের কিছু বন্ধু-বান্ধব ও সিনিয়র ভাই আছে তাদের কারো কারো সঙ্গে অনেক বছর পর দেখা হলো। তারা যুক্তরাজ্য সরকারের রাজনীতি করে, বর্তমানে ক্ষমতায় আছে, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তারা আমাকে সহযোগিতা করবে। আর সিলেটে খুব ভালো মিটিং হয়েছে। সিলেটে কিভাবে সাংগঠনিক কাজ করা যায় এসব বিষয়ে আমাদের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট আনসার খান, এমপি মোকাব্বির খান সাহেব, নিলেন্দ্র দেব- তাদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। আর এমনিতে সিলেটে যেতে সবসময় ভালো লাগে। ওখানেই আমার বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায়।

আপনার বাবা প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়া আওয়ামী লীগের একজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু আপনি গণফোরামের রাজনীতি করছেন। আপনার এলাকার লোকজন, শুভাকাঙ্ক্ষিরা বিষয়টি কীভাবে নিচ্ছে?

আমার কাছে আওয়ামী লীগ যে আদর্শে ছিলো, সে আদর্শ থেকে তারা সরে এসেছে। আর এখন আওয়ামী লীগ দেশে যে কাজগুলো করছে। সেই কাজগুলোর আমি অংশীদার হতে চাই না। সুতরাং খুব পরিস্কার কেনো আমি আওয়ামী লীগে যোগ দিইনি। আর আমার এলাকার লোকজনের এ ব্যাপারে তেমন কোনো কঠিন মত নেই। তারা আমি যে দলেই যুক্ত হইনা কেনো আমার বাবার প্রতি, আমাদের পরিবারের প্রতি তাদের ভালোবাসা আছে। বিশেষ করে বাবার প্রতি। আমার বাবা উনাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন আর এলাকায় আমাদের সম্মানজনক একটা স্থান আছে। এটার কারণে এ ব্যাপারে কারো কিছু বলার নেই। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ালেও তারা খুশি। এটা আমার ব্যাপার।

আওয়ামী লীগ এবং গণফোরাম দুটো দলই আদর্শ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে মানে। আপনি বললেন, আওয়ামী লীগ তাদের আদর্শ থেকে সরে এসেছে। বিষয়টা একটু ব্যাখা করলে ভালো হয়।

আওয়ামী লীগ কথায় বঙ্গবন্ধু। কিন্তু কাজে তারা আইয়ুব খান। এটা সবাই জানে, এটা বুঝে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সাথে এখনকার আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, আমাদের সংবিধানে যেগুলো আছে। সেটার সাথে এই সরকারের কোনো মিল নেই। জনগণ যে দেশের মালিক এই কথাটা বললে এখনকার আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা হাঁসে, তারা ভাবে তারাই দেশের মালিক, এটা তাদের বাবার সম্পত্তি।

বিরোধীতা করার বিষয়ে আমাদের সংবিধানিক অধিকার আছে। আমরা যখন যেখানে ইচ্ছা সভা-সমাবেশ করতে পারি। এটাতো আইয়ুব খাঁন, ইয়াহিয়া খাঁনের আমল না, যে যখন-তখন ১৪৪ ধারা জারি করবে। একটা হলে মিটিং করতে গেলে আমাদের পুলিশের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু কেনো?। পুলিশের কোনো অধিকার নেই আমাদের বাধা দেওয়ার।

রংপুরে দুইশ জনের একটা মিটিংয়ের আমরা অনুমতি নিলাম ডিসি, এসপির থেকে। ঢাকা থেকে খবর আসলো যে গণফোরামের কোনো মিটিং করতে দেওয়া যাবে না। আমার নেতাকর্মীরা খুব হতাশ ছিলো, আমি তাদের বললাম, এটা তো খুশি হওয়ার কথা যে, ঢাকায় সরকার বসে গণফোরামের দুইশ জনের মিটিংয়ের ভয়ে কাঁপে। এটা তো খুশির খবর। দেশের স্বার্থে এই দেশ পরিচালনা হবে। দেশের মানুষের স্বার্থে। কোনো বিদেশিদের জন্য নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেখেন আমাদের এই সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। আমাদের দেশের স্বার্থ তারা রক্ষা করতে পারেনি। তাদের পদত্যাগ করা উচিত, তারা ব্যর্থ, অদক্ষ এবং একেবারে অযোগ্য।

আমাদের সংবিধানের অনেককিছু থেকে তারা সরে এসেছে। আমাদের দেশে বৈষম্যতা যে বেড়েছে। আমাদের সংবিধানে এটার বিরুদ্ধে একটা শক্ত অবস্থান দেখিয়েছিলেন তাজউদ্দিন সাহেব, বঙ্গবন্ধু, ড. কামাল হোসেন। কিন্তু এখন আমরা কাদের রাজত্বে আছি। শেয়ার মার্কেট একটা মহল দখল করে রেখেছে। ব্যাংক থেকে লুট করে ২০ শতাংশ স্ট্রেস লোন আইএমএফ এর লেটেস্ট রিপোর্ট এবং আইএমএফ বলছে ৪০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষ গরিব হচ্ছে। মাথাপিছু আয় সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ লোকের কমে গেছে গত ১০ বছরে। টাকার অ্যামাউন্টটা কমে গেছে আর টাকা যেটা কিনতে পারে সেটা তো আরও বেশি কমে গেছে রিয়েল টার্ন যেটা বলে। সুতরাং প্রত্যেকটা জিনিস থেকে আমরা কতদূর সরে এসেছি বুঝতে হবে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। আমরা সেই আদর্শে ফিরে যেতে চাই যেই আদর্শের জন্য এতগুলো মানুষ প্রাণ দিলো, এতো কষ্ট করলো। এই আওয়ামী লীগ সেই আওয়ামী লীগ না।

আমার বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। কিন্তু আমি আমার বাবা শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যার বিচার এখনো পাইনি। বরং আমরা আমার বাবার হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশ-বিদেশে যেই গণসাক্ষর অভিযান চালিয়েছিলাম ‘রক্তের অক্ষরে শপথের সাক্ষর’ সেটা সংসদ ভবনের সামনে যেদিন প্রদশর্নীর আয়োজন করি সেইদিন আওয়ামী লীগ হরতাল ডেকেছিলো। তখন আমি বলেছিলাম, আমরা প্রদশর্নীটা করবোই। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ অর্ধদিবস হরতাল পালন করে।

গণফোরামে এখন সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুর ভূমিকা কী?

উনি এখন আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য। উনি একটা সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গণফোরামের একটা কঠিন সময় উনি পার করে দিয়েছেন। এটার জন্য আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন উনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন। আমি চেষ্টা করছি দলটাকে শক্তিশালী করার। সবারতো একই ধরনের স্কিল সেন্স থাকেন না। উনার কিছু ছিলো এবং আমার ভিন্ন স্কিল সেন্স। আমি দেখি দলটাকে কীভাবে উপকৃত করা যায়।

এক্ষেত্রে আপনি কি কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, সহযোগিতা কতটুকু পাচ্ছেন?

একটা গণতান্ত্রিক দলে সবাই তো একমত হয় না। জার্মানরা যেটা বলতো পিউরোর প্রিন্সিপাল। আমরা এটাতে বিশ্বাস করি না। যে একজন নেতা, এবং সেই নেতা একটা পুজোনীয় জিনিস এটা আমরা বিশ্বাস করি না। দলের মধ্যে আমার সাথে মতোবিরোধ থাকতে পারে, অনেক কথা থাকতে পারে এবং প্রত্যেক দলে, প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দলে এটা থাকে। বিরোধীতা থাকেই। কোনো একটা কাজ আমি একভাবে করতে চাই, আরেকজন আরেকভাবে চায়। আমরা একসঙ্গে আলাপ করে, তর্ক করে ঠিক করি যে কোন পথে চলা উচিত।

আপনারা সরকারের পদত্যাগ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচনের জন্য গণফোরাম এখন কতোটা প্রস্তুত? কয়টি আসনে প্রার্থী দিতে পারবেন?

আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত না। আমরা সরকার বিরোধী কর্মসূচির চেয়ে নিজেদের সাংগঠনিক কাজকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। সরকার নিজেরাই তাদের পতন ঘটাবে। আমি মনে করে আমাদের দলের মধ্যে সাংগঠনিক কাজটা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটা সবাইকে বলছি। যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে এবং আমরা হলো ভোটের পার্টি। জনগণের ভোটে আমরা একদিন ইনশাআল্লাহ ক্ষমতায় যাবো। তবে আমাদের প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন হয়নি। আমাদের সংগঠনিক কাজগুলো কয়েকটা এলাকায় অনেক ঘাটতি আছে।

জনগণ আপনাদের কেন ভোট দিবে, আপনারা তাদের জন্য কী করবেন?

আমাদের ইশতিহারে অনেক কিছু লেখা আছে। এর মধ্যে মৌলিক কিছু বিষয় বলতে চাই। প্রথমত এই দেশের মালিকানা আমরা জনগণকে ফেরত দেবো। জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে একটা সরকারকে বেছে নেবে এবং যদি সরকার তাদের পছন্দমতো কাজ না করে তাহলে ভোটের মাধ্যমেই বিদায় করবে। সুতরাং জনগণ দেশের মালিক তারাই নির্ধারণ করবে কারা ক্ষমতায় যাবে।

দুই নম্বর হলো- দেশের আয় এবং সম্পদের যেই বৈষম্য। এটা কমানোর চেষ্টা করবো। কারণ গত দশ বছরে আমাদের দেশে বৈষম্যতা অনেক বেড়ে গেছে এবং এটা কমানো নৈতিকভাবে দরকার। এছাড়া আমাদের গরিব বাচ্চাদের খেতে না দিলে ভবিষ্যত খুব অন্ধকার। তাদের মাঝে শিক্ষাটা ঠিকমতো দিতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ঠিক করতে হবে এবং তাদের পুষ্টির ব্যপারে আমরা কিছু পদক্ষেপ নেবো। তাদের স্বাস্থ্যের ব্যপারে কিছু করবো। তারা আমাদের ভবিষ্যত। ওদেরকে না খাইয়ে রেখে আমাদের এক হাজার কোটি টাকার মালিকরা বিদেশে প্রাসাদ বানাবে, এটা ওই লোকদের জন্য ও গোটায় কয়েক মানুষের জন্য ভালো। কিন্তু দেশের জন্য এটা একটা সর্বনাশ।

তিন নম্বর হলো- প্রত্যেক মানুষের মেধা বিকাশের জন্য আমরা একটা ব্যবস্থা নেবো। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে, ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা ও ভালো একটা বিচার ব্যবস্থার পাওয়ার- এটা আমরা করবো। তারপর প্রশাসনে গুণগত মানের একটা পরিবর্তন দরকার। সবাই জানে, আমাদের প্রশাসন সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজার মতো ব্যবহার করে। আপনি আশ্চর্য হবেন, যখন বিদেশে একজন নাগরিক প্রশাসনের কারো সঙ্গে দেখা করে তাকে স্বসম্মানে ট্রিট করা হয়। আর আমাদের এখানে প্রশাসন রাজা। আর যাদের করের টাকায় তারা রাজা হয়েছে ওই জনগণ তারা প্রজা। এই সিস্টেমটাকে বদলাতে হবে।

সবশেষ বিরোধীতা করার একটা অধিকার, ভিন্নমতের অধিকার। গণফোরাম যখন ক্ষমতায় যাবে আমাদের বিরুদ্ধে লোকে অবস্থান নিবে। আল্লাহ ছাড়া কেউ নিখুত না। আমাদের কাজে ভুল-ত্রুটি থাকতেও পারে। লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু কথা বলে কেউ সাদা কাপড় পরে বাড়িতে ফিরবে না, কোনো মিথ্যা মামলা হবে না বা কেউ মারধর করবে না। বিরোধীতা করে বাসায় গিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাবে, পরেরদিন আবার বিরোধীতা করবে। এই অধিকার গণফোরাম নিশ্চিত করবে। এই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি এই দেশে ফেরত আনার ওয়াদা আমরা করতে চাই।

সাক্ষাতকারের প্রথম পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন