একাত্তরের এইদিনে অবরুদ্ধ ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে পরিচালিত হয়েছিল এক দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে (তৎকালীন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ) ছিল সে সময়কার অভিজাত বিপণীবিতান গ্যানিজ এবং ভোগ, দুটো’র মালিকানাই ছিল অবাঙালি’দের।

দিনটি ছিল রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিকেল ৪ টায় গেরিলা যোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক এবং মানু দুঃসাহসী এ অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন। তাঁদের ব্যাক আপ কভার হিসেবে একটি টয়োটা গাড়িতে ছিলেন অপর তিন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা আব্দুস সামাদ, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত এবং শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল বীর বিক্রম।

তাঁরা অপারেশন পূর্ব রেকি সম্পন্ন করেন ১৭ জুলাই শনিবার। সেদিনই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় পরদিন অপারেশন পরিচালিত হবে। পরদিন রোববার (১৮ জুলাই) বিকেল ৪ টায় গেরিলারা একটি ৯০ সি.সি হোন্ডায় চড়ে আসেন।

গেরিলা মানু হোন্ডাটি চালাচ্ছিলেন পেছনে মায়া চৌধুরী এবং গাজী দস্তগীর। তাঁদের সাথে ছিল একটি স্টেনগান, কয়েকটি গ্রেনেড-৩৬ এবং ফসফরাস বোমা। সে মুহূর্তে গ্যানিজের মূল দরজার বাইরে প্রহরায় ছিল ৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ। হোন্ডা দাঁড়ানো মাত্র গোলাম দস্তগীর গাজী হাতের স্টেনগান বের করে দৌড়ে মূল দরজার সামনে চলে যান, ঠিক তাঁর পেছনে মায়া চৌধুরী ছিলেন। মুহূর্তের ভেতর গাজী দস্তগীর বার্স্ট ফায়ার করেন এবং মায়া পেছন থেকে একটি ৩৬ গ্রেনেড ও ফসফরাস বোমা ছুঁড়ে মারেন ভেতরে।

প্রকাশ্য দিনের বেলায় প্রচুর জনসমাগমের মুখে এমন গেরিলা আক্রমণ ঢাকাবাসী ইতোপূর্বে কখনো দেখেনি। মুহূর্তেই জনশুন্য হয়ে যায় রাস্তা। গ্যানিজ আক্রমণ শেষ করেই তাঁরা একই হোন্ডায় চড়ে চলে যান পরবর্তী টার্গেট ভোগের সামনে। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখেন গ্যানিজ অপারেশনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভোগ মূল দরজার শাটার নামিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে মাত্র ২/১ হাত খোলা। সামান্য সেই ফাঁকা স্থানেই তাঁরা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ফসফরাস বোমা।

সেদিনের এই দুর্ধর্ষ অপারেশনে গ্যানিজের সামনে উপস্থিত ৪ পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ নিহত হয়েছিল। ঢাকাবাসী বিস্ময়ের সাথে দেখেছিল দাপুটে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নাকের ডগায় কলজে কাঁপানো গেরিলা অপারেশন।

অবরুদ্ধ ঢাকার বাসিন্দাদের ভেতর ভয় ও মৃত্যুশঙ্কা, তবুও মানুষ ক্রমশ আশাবাদী হয়ে উঠছিলেন। কারণ, মৃত্যুপুরী ঢাকায় স্বাধীনতাকামী দুর্ধর্ষ গেরিলাদের সরব উপস্থিতি তখন বাস্তব ঘটনা। ঢাকায় পরিচালিত গেরিলা অপারেশনগুলো যেন ছিল স্বাধীনতারই আগমনী ধ্বনি।