জীবিকার তাগিয়ে মানুষকে সব সময় কোথাও না কোথাও যেতে হয়। সেটা গ্রাম, সদর, জেলা কিংবা হতে পারে ভিন্ন শহর। একটি পরিবার চায় পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনে নিয়োজিত কর্মব্যস্ত মানুষটি দিন শেষে বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কি পরিবারের এই ন্যূনতম দাবি পূরণ করতে পারছে?

স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই- জনপ্রিয় এই দাবি ও সেøাগানের জনক বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ শ্রদ্ধেয় নির্মল সেন। বেশ কিছু বছর আগে নির্মল সেন দাবি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। এত বছর পেরিয়ে গেলেও এই দাবি পূরণ হয়নি। কিন্তু এটাই তো একটি স্বাধীন, সচেতন, সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিকদের ন্যূনতম দাবি। মানুষের বেঁচে থাকার সামান্য চাহিদায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কিন্তু আজ নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তাটুকু নেই। প্রিয়জনের মুখে হাসি যারা ফুটিয়ে রাখে, তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ঘরে ফিরে আসে না। প্রতিদিন রাস্তায় অকাতরে প্রাণহানি হচ্ছে। প্রাণ যাছে দলীয় ক্যাডারের হাতে, মাস্তানদের হাতে, কন্ট্রাক্ট কিলারদের হাতে এবং সর্বোপরি দেশ ও জনগণের রক্ষক পুলিশের হাতে। সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে দেশের নীতিনির্ধারকদের তেমন কোন মাথা ব্যথা থাকে না।

ছিনতাই, ইভটিজিং, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, দুর্নীতি, খুন-জখমে স্বাভাবিক জনজীবন আজ অতিষ্ঠ। এই তো কিছুদিন আগে সিলেটে পুলিশের হেফাজতে রায়হানকে পিটিয়ে জখম করার পর হত্যা করা হয়। করোনা কালে পুলিশ, ডাক্তারদের কর্মকাণ্ডে সত্যিই আমরা গর্বিত ছিলাম। পুলিশ জনতা যে ভাই ভাই, পুলিশ যে জনগণের প্রকৃত বন্ধু তা আমরা হাতে কলমে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু মেজর সিনহা হত্যা, পুলিশি হেফাজতে যুবক রায়হানের হত্যা যেন বলে দেয়, আজ কেউ নিরাপদ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পুলিশের হেফাজত সব জায়গায় যেন আজ হত্যাযজ্ঞ চলে। রায়হান হত্যার কিছুদিন না যেতেই মোস্তাফিজুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক মেধাবী ছাত্র জীবিকার প্রয়োজনে সাভারে একটা স্কুলে চাকরি করত, বাড়ি থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যার স্বীকার হয়। এমন আবরার, রায়হান, সিনহা, মোস্তাফিজুর হাজারো উদাহরণ চোখের সামনে বিদ্যমান।

আজ মানুষ এমন হত্যাযজ্ঞ সমাজ ব্যবস্থা চায় না। গুটিকয়েক সন্ত্রাসী, ধর্ষণকারী, কিছু অসাধু সরকারী কর্মকর্তা, দুর্নীতিবাজ এদের হাতে বন্দি থেকে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু চায় না। মানুষ এমন একটা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা চায় যেখানে চিকিৎসালয় নামের কসাইখানা থাকবে না, থাকবে কর্মক্ষেত্রের নিশ্চয়তা, থাকবে না ধর্মীয় উগ্রবাদ, থাকবে না ভিন্ন মতের ওপর নির্যাতন, কর্মস্থল থাকবে নিরাপদ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য থাকবে হাতের নাগালে, কেউ ছুরিকাঘাতে বা ধর্ষণের শিকার হবে না।

মানুষের দিনপঞ্জিকায় ধীরে ধীরে জমা হওয়া ক্ষোভগুলো আজ বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শিখছে স্বাভাবিক ও নিরাপদভাবে বাঁচতে হলে আগে রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখা: মো. আরিফুল ইসলাম