এই মুহূর্তে আমাকে যদি একটি আলাদীনের চেরাগ দেয়া হয় এবং তিনটি বর দিয়ে বলা হয়, আমার স্বপ্নের জায়গাটিতে বাংলাদেশকে দেখার জন্য আলাদীনের চেরাগের কাছে আমার কী কী চাওয়ার আছে? আমি চোখ বন্ধ করে তিনবারই জোর দিয়ে চাইবোÑ সুনাগরিক, সুনাগরিক এবং সুনাগরিক। আমরা বাজারে বিভিন্ন ধরনের গাইড বই দেখে থাকি, যেগুলোতে লেখা থাকে একের ভেতর সব। সেই গাইড বইয়ের মতোই একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্যও সুনাগরিকের ধারণাটিকে একের ভেতর সব বলেই মনে করি। রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তিই যদি হন সুনাগরিক তবে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ প্রতিটি খাতের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। কেননা প্রতিটি সুনাগরিকই রাষ্ট্রের বিরাট অংশ।

বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বত্র বিরাজমান অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, খুন-রাহাজানি, সা¤প্রদায়িকতা, আদর্শহীনতা, বিচারহীনতা, হিংস্রতা, ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতা, ভোগবাদিতা, দেশের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার প্রভৃতি ঘৃণ্য কাজের নেপথ্যে রয়েছে সুনাগরিকের অভাব। সুনাগরিক হতে না পারার কারণেই স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্তে¡ও আমাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না এবং প্রত্যাশা পূর্ণতা পাচ্ছে না। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের তকমা গায়ে জড়িয়ে নাগরিক অধিকার ভোগ করাতে আমাদের যতটা তৎপরতা, সুনাগরিক হয়ে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমাদের ততটাই অনীহা।

তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সুনাগরিক নিশ্চিত করা গেলে তবেই ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, ধর্ষণমুক্ত, সুশিক্ষিত, সুদক্ষ ও সমৃদ্ধশালী স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আমরা জানি, একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রধান ও অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে জনসমষ্টি। যেকোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য জ্ঞানের ওপর রাষ্ট্রটির কার্যক্রমের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে। তাই দেশের জনসমষ্টিকে যদি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ উন্নতির শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হবে। রাষ্ট্র ও মানবতার কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে সুনাগরিক বলে। একজন নাগরিককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় পদ্ধতি হচ্ছে শিক্ষা। একটি শিশুর অন্তর্নিহিত সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়ভার বর্তায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর। শিক্ষার্থীদের যথাযোগ্য নৈতিক মানসম্পন্ন সুনাগরিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলার নিমিত্তে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিষয়ক আলোচনার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনোজগতকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতাবোধ, সহমর্মিতাবোধ, ঔদার্য, দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা, বিশ্বস্ততা, সচেতনতা, সততা ও পরমতসহিষ্ণুতা জাগিয়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে করতে হবে মর্মস্পর্শী।

একজন সুনাগরিকের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে স্বদেশপ্রেম। দেশের প্রতি মানুষের অন্যায়-অবিচার তথা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে দেশপ্রেমের অভাব। দেশপ্রেম নেই বলেই আজ তারা দেশের উন্নয়ন না করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের পেটের উন্নয়নে, নিজেদের ভোগ-বিলাসিতায়। লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে সোনার মাতৃভ‚মিকে। দেশমাতৃকার আহাজারিতে বিষিয়ে উঠছে বাংলার আকাশ-বাতাস। চলমান অনিয়মের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি পেতে বাড়াতে হবে ভালোবাসার চর্চা এবং দেশ ও জাতিকে ভালোবাসার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। কোনো সুনাগরিকই দেশকে ভালোবাসার পবিত্র দায় এড়াতে পারে না। নিজের বিলাসিতার জন্য দেশকে বিক্রি করে দেয়া নয়, বরং দেশের কল্যাণে ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজের জীবনকে বাজি রাখার মানসিকতা ধারণ করতে হবে।

সুনাগরিক হওয়ার এই জোর দাবি শুধু সাধারণ জনগণের জন্যই নয়। নাগরিক বলতে আমরা একটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী সবাইকে বুঝে থাকি। তাই তৃণমূল পর্যায় থেকে সরকার, নীতিনির্ধারক থেকে নীতির বাস্তবায়ক, জাতি গড়ার কারিগর থেকে সমগ্র জাতি, রাজনীতিবিদ, বিচারব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, কলাকুশলী, কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সর্বক্ষেত্রের মানুষেরাই সুনাগরিক হওয়ার আহŸানের অন্তর্ভুক্ত। সবাইকে সবার জায়গা থেকে স্বচ্ছ ও কর্তব্যনিষ্ঠ হতে হবে। সততার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিবেদিত প্রাণ হতে হবে। একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক। একটা সময় মহান নেতারা রাজনীতিতে আসতেন দেশ ও দশের মুক্তির মশালবাহক হয়ে; প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে নিজেদের জীবন বিপন্ন করতেও পিছপা হতেন না। কিন্তু লজ্জাজনক হলেও সত্য যে বর্তমানে অধিকাংশ রাজনীতিবিদরাই রাজনীতিতে আসে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার আশায়। শুধু রাজনীতিবিদরাই না, প্রতিটি সেক্টরেই দেশের টাকা লুটপাট করে কোটিপতি হওয়ার ঘৃণ্য প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। এমনকি জাতি গড়ার কারিগর তথা শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ও চোখ কপালে তোলার মতো। তারাও নিজেদের আখের গোছানোর স্বার্থে জঘন্যভাবে দলাদলিতে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থাকে গ্রাস করতে বসেছে, সেটার মূলেও রয়েছে মানবিক গুণসম্পন্ন সুনাগরিকের অভাব। তাই প্রতিটি পদে তথা প্রতিটি সেক্টরে সুনাগরিক নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ শৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত করা যাবে এবং স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
লেথা: সুমনা মৃধা