ডেস্ক রিপোর্ট: নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার লক্ষ্যে একটি সাধারণ সুরক্ষা ও নীতি কাঠামো তৈরির জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ শনিবার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

এ খবরে রোববার (১০ অক্টোবর) ভাসানচরে আনন্দ মিছিল করেছে রোহিঙ্গারা। এ সময় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে স্বাগত জানিয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা যায় তাদের। এক দল মানুষ আনন্দ মিছিলে যুক্ত হয় মাইক নিয়ে। মিছিলটি ভাসানচরের ক্যাম্প হেড ফোকালদের নেতৃত্বে সিআইসি অফিস (শেল্টার-৯) থেকে হাসপাতাল রোড হয়ে ১নং রোহিঙ্গা বাজারের সামনে এসে শেষ হয়।

দ্বীপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা জানান, জাতিসংঘের এই যুক্ততায় রোহিঙ্গারা অত্যন্ত আনন্দিত। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে তারা।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর উপলক্ষে মিছিলে প্রায় ১ হাজার মানুষ অংশ নেন। এ সময় রোহিঙ্গারা নিজেদের বানানো প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করে। তাতে লেখা ছিল- ওয়েলকাম ইউএন, ওয়েলকাম ইউএনএইচসিআর, থ্যাংকস ইউএন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ভাষায় রচিত গান ও কবিতাও মাইকে বাজানো হয়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে গত চার বছর আগে সব ফেলে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে কাজ করছে বাংলাদেশ। প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ভালো পরিবেশে রাখতে নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছে সরকার। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির থেকে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে দ্বীপটিতে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

শুরুতে জাতিসংঘ এ নিয়ে আপত্তি জানালেও পরে পরিদর্শন শেষে সমর্থন জানায়। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘ কীভাবে সম্পৃক্ত হবে, এ বিষয়ে শনিবার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।

শনিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে কর্মরত জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর পক্ষে ইউএনএইচসিআরের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে ইউএনএইচসিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এই সমঝোতা স্মারক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও টেকসই ব্যবস্থায় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের উদারতা এবং সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। এতে আরও বলা হয়, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের অব্যাহত সমর্থনের অঙ্গীকারেরও পুনর্নিশ্চয়তা।

ভাসানচর সংক্রান্ত এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বীপে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার সুবিধার্থে সেবা ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অনুমোদন দেওয়া হলো। সমঝোতা স্মারকটি শিক্ষা, দক্ষতা-প্রশিক্ষণ, জীবিকা এবং স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়, যা শরণার্থীদের দ্বীপটিতে শালীন জীবনযাপনে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে মিয়ানমারে টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করবে। দ্বীপটিতে বাংলাদেশি এনজিওর মাধ্যমে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবিক সহযোগিতা পরিপূরক ভিত্তি তৈরি করবে।

এমওইউ স্বাক্ষরের আগে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা কমিউনিটি এবং দ্বীপটিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জাতিসংঘ আলোচনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের চাহিদা ও মতামত ভালোভাবে বোঝার জন্য ২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের ভাসানচর সফর।

ইউএনএইচসিআর বলেছে, এই আলোচনা দ্বীপে কাজ করা সরকারের সমকক্ষীয় ও এনজিওগুলোর সঙ্গে নিয়মিত চলতে থাকবে এবং ভাসানচরে যেকোনো মানবিক ও সুরক্ষার বিষয় ইউএনএইচসিআরকে অবহিত করবে। ইউএনএইচসিআর বলেছে, জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে উদার মানবিক সহায়তার বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, যৌথ পরিকল্পনায় কক্সবাজারে মানবিক সহায়তায় যে অর্থ এই বছরের জন্য ধার্য করা ছিল, তার অর্ধেকের কম তহবিল এসেছে। এতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘ, বাংলাদেশ সরকার এবং পাশাপাশি দেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে স্থায়ীভাবে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ৩১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ রোহিঙ্গার থাকার জন্য ভাসানচরে আশ্রয়ণ-৩ বাস্তবায়ন করেছে। এখন পর্যন্ত কক্সবাজার থেকে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

ভাসানচরে মোট ১২০টি পাকা ঘরের গুচ্ছগ্রাম ও ১২০টি সাইক্লোন শেল্টার, স্কুলঘর, হাসপাতাল, খামার ও মাছ চাষ, খেলার মাঠ এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে। বাস করার স্থান হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রের চেয়ে এটা অনেক ভালো।