সজিব খান, ঢাকা থেকে:
অপেক্ষার প্রহর ফুরালো। উদ্বোধন হলো বাঙালির বহুল আকাঙ্খিত নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। শত বাধা বিপত্তি, দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র, গুজব, প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অবশেষে খরস্রোতা পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে দ্রোহের সেতু। সত্যি হলো কোটি বাঙালির স্বপ্ন। এ যেন বীর বাঙালির আরেক বিজয়।

শনিবার (২৫ জুন) সকালে প্রমত্তা পদ্মার বুকে বিশ্বের কাছে বাঙালির সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজায় নিজ হাতে টোল পরিশোধ করে পদ্মা সেতুতে উঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Advertisement
কম খরচে বীর বাঙালির মতো নিউজপেপার ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান?

আগ্রহী হলে ক্লিক করুন (www.bdwebsite.net)

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে এদিন পদ্মার দুই প্রান্তে ১০ লাখ লোকের জনসমাগমের আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

এর আগে, সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে যমুনা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। ১৯৭৬ তিনি জাপান সরকারের সহায়তা চান। সালের অক্টোবর মাসে জাপান সফরকালে যমুনা নদীর উপর সেতু নির্মাণের জন্য ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ১৯৯৮ সালের ২৩-এ জুন আমি ওই সেতুর উদ্বোধন করি। ১৯৯৭ সালে জাপান সফরকালে আমি পদ্মা নদী এবং রূপসা নদীর উপর সেতু নির্মাণের সহযোগিতা চাই। জাপান সরকার দুটি নদীর উপরই সেতু নির্মাণে রাজি হয়। আমার অনুরোধে ওই মেয়াদেই রূপসা নদীর উপর সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়। যেহেতু পদ্মা অনেক খরস্রোতা, বিশাল নদী, ভাই পদ্মা নদীর সমীক্ষার প্রয়োজন হয়। ২০০১ সালের মাঝামাঝি পদ্মার নদীর উপর সেতু নির্মাণের সমীক্ষার কাজ শেষ করে জাপান। স্থান নির্বাচন করে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে। এই সমীক্ষার ভিত্তিতে ২০০১ সালের ৪ঠা জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে আমি মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে আমরা সরকারে আসতে পারিনি। ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামাত জোট সরকার মাওয়া প্রান্তে সেতু নির্মাণে অনীহা দেখায়। তারা জাপান সরকারকে পুনরায় মানিকগঞ্জের আরিচায় পদ্মা সেতুর জন্য সমীক্ষা করতে বলে। দ্বিতীয়বার সমীক্ষার পর জাপান বর্তমান মাওয়া-জাজিরা প্রান্তকেই বাছাই করে পদ্মা সেতু নির্মাণের রিপোর্ট পেশ করে। বিএনপি-জামাত জোট সরকার ২০০১-২০০৬ মেয়াদে এই সেতু নির্মাণের বিষয়ে আর কোন উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসি। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ২২ দিনের মাথায় সেতুর নকশা তৈরির জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক আলাপ-আলোচনার পর বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা এই সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করতে সম্মত হয়। কিন্তু কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর প্ররোচনায় ভিত্তিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে যায়। পরবর্তীকালে অন্যান্য অংশীদারগণও বিশ্বব্যাংকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তারপর পানি অনেক ঘোলা করা হয়েছে। তথাকথিত নাগরিক সমাজের এক শ্রেণির প্রতিনিধি, কতিপয় মিডিয়া, স্বঘোষিত অর্থনীতিবিদগণ সরকারের তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠেন। অনেকটা চিলে কান নিয়ে গেছে প্রবাদ বাক্যের মত অবস্থা। কেউ ন্যুনতম অনুসন্ধান পর্যন্ত করলেন না যে, যে প্রকল্প একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে তাতে কীভাবে দুর্নীতি হতে পারে? দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে জানাল যে, কোন দুর্নীতি হয়নি। কিন্তু তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু কানাডার আদালতে যখন পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি হয়নি বলে রায় দিল, তখন সবাই চুপ হয়ে গেলেন। কারও মুখে কোন কথা নেই। তাদের কারণে আমাদের কয়েকজন সহকর্মী যে মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেন তা নিয়ে সামান্য দুঃখ পর্যন্ত প্রকাশ করলেন না। কিন্তু আমি জানতাম, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কোন ষড়যন্ত্র হয়নি। আর এ কারণেই এই সেতু নির্মাণে আমার জেদ চাপে। সকলেই যখন হতাশ, তখন আমি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেই। শুধু তাই নয়, এ সেতু নির্মাণে বিদেশি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেই। এই ঘোষণার পর আপনারা দেখেছেন, কিছু কিছু মানুষ কীভাবে নানা নৈরাশ্যবাদী এবং হতাশাব্যঞ্জক কথাবার্তা বলেছেন। নিজেদের।টাকায় এই সেতু তৈরি করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, আগতি স্থবির হয়ে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তারা। আজকে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বসে পড়েনি। বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের কাছে আমরা প্রমাণ করেছি, আমরাও পারি।’ পদ্মা সেতু তাই আত্মমর্যাদা ও বাঙালির সক্ষমতা প্রমাণের সেতু শুধু নয়, পুরো জাতিকে অপমান করার প্রতিশোধও। বাংলাদেশের জনগণই আমার সাহসের ঠিকানা। আমি তাঁদের স্যালুট জানাই।

১৯৭১ সালে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন, ‘বাঙালি মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না’। সত্যিই বাঙালিকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। মাত্র নয় মাসেই যুদ্ধ জয়ী হয়েছিল মুক্তিকামী বাঙালি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর সেই বাঙালি কংক্রিটের এক সুবিশাল স্থাপনার মধ্য দিয়ে আরেকটি বিজয় অর্জন করল। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে সফলভাবে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ হওয়ায় আবারও প্রমাণ হলো বাঙালি বীরের জাতি, কোনো ষরযন্ত্র, কোনো বাধাই বাঙালিকে তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে না। শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে বাঙালি তার স্বপ্ন জয় করবেই।

২০০১ সালের ৪ জুলাই স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের নভেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাসের এ সেতুর ওপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরে একটি একক রেলপথ রয়েছে।

পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ৪২টি পিলার ও ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যানের মাধ্যমে মূল অবকাঠামো তৈরি করা হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার। এই সেতুর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার স্বপ্নের কাঠামো নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড।

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তন করার পাশাপাশি, এটি জাতীয় আয়ের কমপক্ষে ১.৫% বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রোববার (২৬ জুন) সকাল ৬টা থেকে নির্ধারিত টোল দিয়ে পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল শুরু হবে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। একইসঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও অভিনন্দন জানানো হয়েছে।