খসরু-ওরা ১১ জন এর চিত্রনায়কঃ-
কামরুল আলম খান খসরু বাংলার ইতিহাসে দুরন্ত নাম।অনেক বাঙ্গালি আছে এদেশে যারা স্বাধীনতা চায়নি। শুধুমাত্র রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস নয়। এদের ছাড়াও একটা গোষ্ঠি যুগে যুগে বিশ্বাস করে এসেছে বাংলাদেশ জন্ম হওয়াটা ভূল ছিল।আর এদের কারনেই সূর্য-সন্তানরা অবহেলিত ছিল, এখন আছে।তাইতো আজও বড় শত্রু এই কামরুল আলম খান খসরু ও সিরাজুল আলম খান দাদাভাই।যাদের হাত ধরে এসেছে এই বাংলা,তারাই আজ জন বিছিন্ন। ক্ষমা চাইবার ভাষা নেই।তবু ক্ষমা চাই, ক্ষমা করো হে মহাবীর।।

জাতীয় মহাবীর খসরু, বাইপাস অপারেশন শারীরিক বিপর্যয়ে এখন শয্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু যেন জীবনের যুদ্ধে আজ বড় অসহায়। কেউ তার খোঁজ রাখে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া বাড়িটি সেনাশাসক জিয়া বাতিল করে দেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও তার বাড়িটি ফিরে পাননি। এমনকি তার চিকিৎসারও ব্যয়ভার বহন করেনি সরকার। ষাটের দশকের ছাত্রলীগ রাজনীতিতে পশ্চিমা শাসকদের লাঠিয়ালদের উৎখাত, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে অপ্রতিরোধ্য সাহসী জুটি কামরুল আলম খান খসরু ও মোস্তফা মহসীন মন্টু মানে যারা ইতিহাসের এক সাহসী কিংবদন্তি জুটি। মন্টু মাঝেমধ্যে তার খোঁজ নেন।

ঢাকার খানবাহাদুর নূরুল হক খানের দৌহিত্র কামরুল আলম খান খসরু। চাচাত ভাই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সিরাজুল আলম খানের প্রেরণায় ষাটের দশকের শুরুতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া খসরু ধীরে ধীরে শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফাকে পাশ কাটিয়ে তা স্বাধীনতার ১ দফায় পরিণত করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের আন্দোলন-সংগ্রামের নেপথ্য নায়কের ভূমিকায় থাকা খসরু এখন অনেকটা নীরবে নিভৃতে একাকী দিনযাপন করছেন। তার কিংবদন্তিতুল্য ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের অমোঘমন্ত্র হিসেবে প্রেরণা জোগালেও ইতিহাসের বিচারে খসরু সবার অলক্ষ্যে থেকে গেছেন। তার পরিচালিত বাহিনীর অনেকে স্বাধীনতার বীরউত্তম, বীরবিক্রম বা বীরপ্রতীকের রাষ্ট্রীয় ভূষণ পেলেও খসরুর চোখে বয়ে যায় একনদী জল। কামরুল আলম খান খসরু এখন সবার অগোচরে। দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। যৌবনের তারুণ্যে উচ্ছ্বসিত উচ্ছল অকুতোভয় মুজিবসৈনিককে যেন দেখার কেউ নেই। ছাত্রলীগের কাছেও খসরু অচেনা মুখ। পারিবারিক আপনজনের বাইরে তার পাশে দাঁড়াচ্ছেন না কোনো স্বজন। পারিপাশ্বিকতাও তার অনকূলে নেই। সহযোদ্ধারাও খোঁজ রাখছেন না অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধার। কামরুল আলম খান খসরু মিডিয়ার লোক এড়িয়ে চলেন। সময় হয়নি তাই বলছেন না কিছু।

এই সশস্ত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে আক্ষেপ করে বললেন, যেহেতু আমার স্বীকৃতি আমার দেশ দিল না, সেখানে আমি দাবি করছি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও এ-দেশি তাদের দোসর জামায়াত-শিবিরসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে- তারাই বলুক খসরু তাদের কয় নম্বর শত্রু ছিল? তারা বলুক, ওদের শত্রু হিসেবে আমার বীরউত্তমের স্বীকৃতিলাভের অধিকার আছে কি না? এ প্রসঙ্গের অবতারণা করতে গিয়ে কামরুল আলম খান খসরু নিঃসংকোচে বলেন, দাদাভাই (সিরাজুল আলম খান) জাসদ করেছেন বলেই আমি শুধু নই, হাজার হাজার নেতা-কর্মী মুক্তিযোদ্ধার সনদ লাভ করেননি। আমি কিন্তু জাসদ করিনি, বরং ভুয়াদেরও মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে কি আপনার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই?- খসরুর সাফ জবাব, ২০০৬ সালে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আমার নাম দেখেছি। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটা সার্টিফিকেট আমার নামে পাঠিয়েছে- এ কথা উচ্চারণ করে কান্নায় ভেঙেপড়া মহাবীর খসরু এরপর যে কথাটি জানিয়ে দিলেন তা আরও বেদনাদায়ক।

১৯৭২ সালের ৩১ মে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কের ২২ নম্বরের (পুরনো) একটি সরকারি বাড়ি দিয়েছিলেন। যুদ্ধজয়ের পর সেখানেই আমরা উঠেছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে ওই বাড়ি থেকে আমাকে উচ্ছেদ করেন। এটাই হলো আমার নিয়তি। হ্যাঁ, এ জন্যই তো মুক্তিযুদ্ধ করে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করেছিলাম- তাই না?

মুজিব-আদর্শে উদ্বুদ্ধ সৈনিকদের মধ্যে কিংবদন্তিতুল্য হয়ে ওঠা খসরু মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও ছাত্রলীগের মিছিল-সভা-সমাবেশে ছিলেন অতন্দ্রপ্র্রহরী। কামরুল আলম খান খসরু ও মোস্তফা মহসীন মন্টু খসরু-মন্টু জুটি হিসেবে সরকারি পাণ্ডাবাহিনী এনএসএফের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রাস পাঁচপাত্তুর ও খোকা এনএসএফ বাহিনী ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড চালনায় ভীত হয়ে উঠলে খসরুর বাহিনী তাদের নির্মূল করে। রমনার রেসকোর্সে খোকার বিকৃত লাশ পাওয়ার খবরে সাধারণ ছাত্রসমাজের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ত্রাস পাঁচপাত্তু ও খোকা নিহত হওয়ার পর এনএসএফ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

পাকিস্তানের সামরিক আদালত খসরু, মন্টু ও সেলিমকে (মন্টুর ভাই) ১৪ বছর কারাদণ্ড দিয়ে হুলিয়া জারি করেন। সরকারি পেটোয়া পুলিশ স্যার ইকবাল হলে (জহুরুল হক হল) খসরুর উপস্থিতি টের পেয়ে হানা দেয়। ওই সময় খসরুকে ১১ ঘণ্টা হলের ছাদে পানির ট্যাঙ্কির ভেতরে কাটাতে হয়। আরেকদিন ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমান (পরে সেনাপ্রধান) ও ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন খসরুর মুখোমুখি হলেও কথাবার্তা শুনে তারা গ্রেফতার এড়িয়ে যান। স্মৃতিচারণ করে খসরু সে সময়ের ইত্তেফাক ও আজাদ পত্রিকার কাটিং দেখিয়ে বলেন, দেখুন বঙ্গবন্ধু আমাদের দণ্ড মওকুফ করার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। একাত্তরের উত্তাল মুহূর্তে নিউমাকের্ট, বায়তুল মোকাররম ও নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের অস্ত্র লুট এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে হামলার কথা উল্লেখ করে খসরু বলেন, আমার সঙ্গে এ সময় ইনু (হাসানুল হক ইনু) জুডো মণি, বাবু ও রেজা শাজাহান ছিল।

একাত্তরের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে কামরুল আলম খান খসরু একটি পয়েন্ট ২২ রাইফেল দিয়ে শূন্যে ফায়ার করে গান স্যালুট প্রদান করে ছাত্রলীগের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেন। নিউক্লিয়াসের রূপকার সিরাজুল আলম খানের নির্দেশে খসরু একটি দুঃসাধ্যও সাধন করেছিলেন সরকারি হুলিয়ার মুখেও। তিনি নীলক্ষেত থেকে দর্জির দোকান খুলিয়ে জাতীয় পতাকার কাপড় সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। একটু বলেন বলতেই কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে বললেন, স্বাধীনতা ছাত্রলীগ না চাইলে আওয়ামী লীগের কিছুই করার ছিল না। আওয়ামী লীগকে ছাত্রলীগই বাধ্য করেছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে সরে দাঁড়াতে। শুনুন আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের আজকের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, স্বাধীনতার ইশতেহার এমনকি স্বাধীনতার স্লোগানগুলোও ছাত্রলীগের। খসরু বলেন, ছাত্রলীগ আন্ডারগ্রাউন্ডেই মুক্তিযুদ্ধের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। নিউক্লিয়াসের নামে গড়ে তোলা হয়েছিল ১০টি গ্রুপ। এগুলো গেরিলা বাহিনীরূপে ১০ নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। সদস্যরা পরিচিতি লাভ করেন একেকটি নিউক্লিয়াস হিসেবে। গ্রুপগুলো এমন ছিল যে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের খবর জানত না। পরবর্তীতে যা বিএলএফ (মুজিববাহিনী) নাম ধারণ করে সশস্ত্রবাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া ‘জাতির পিতা’র ভূষণটিও ছাত্রলীগের।

ষাট ও সত্তর দশকে ঢাকার বুকে ছাত্রলীগের খসরু-মন্টু ছিল এক প্রতিরোধ্য জুটি। খসরুর সেই প্রিয় সহচর মোস্তফা মহসীন মন্টুও রাজনীতির মারপ্যাঁচে হয়েছেন আওয়ামী লীগছাড়া। তবুও মন্টু-খসরুর সখ্যে চিড় ধরেনি এতটুকু। মাঝেমধ্যে সাক্ষাতে কথা হয় দুজনের। দুই বন্ধুই দীর্ঘকাল ধরে সেই একই মোহনার বাসিন্দা। এলিফ্যান্ট রোডের আঙিনা ছাড়েননি শত উত্থান-পতনেও। স্মৃতিতে টানেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। ঢাকাকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করার পথ প্রশস্ত হয়েছিল কামরুল আলম খান খসরুর মতো দুই-চারজন বীর সাহসী যোদ্ধার কারণেই। ঢাকাকে শত্রুমুক্ত করার সেই যুদ্ধজয়ের কাহিনীজুড়ে রয়েছে খসরুর বীরত্বগাথা। জীবন-যৌবনের উত্তাল দিনগুলোতেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন আগ্নেয়াস্ত্র। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ময়দানে কাঁধে স্টেনগান চড়িয়ে বেড়িয়েছেন। সশস্ত্র জীবন শেষে যুদ্ধের বীরত্বগাথাকে অমরত্ব দেওয়ার জন্য নির্মাণ করেন ‘সংগ্রাম’, ‘ওরা ১১ জন’সহ একাধিক চলচ্চিত্র। খসরু নিজেই নায়কের ভূমিকায় রূপদান করে দৃশ্যত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকেই তুলে ধরেন ইতিহাসের পাতায়। এসবই শত্রুর বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার জন্য। দেশ শত্রুমুক্ত হলেও স্বাধীনতায় খুব একটা গা ভাসানোর সুযোগ হয়নি। আপন দেশে নিজেদের মাঝে রক্তারক্তি, হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে নিজেকে আড়ালের চেষ্টাই করেছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সহকর্মীরা অনেকে রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে ভাগ্য গড়ার কাজে মনোনিবেশ করলেও কামরুল আলম খান খসরু ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। মনে কষ্ট, হত্যাকারীদের প্রতিরোধ করতে চাইলেও কারও সাড়া পাননি। যেমন ব্যতিক্রম ছিলেন ছাত্রলীগে-মুজিববাহিনীতে। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে বড় বড় পদেরও কোনো আকাক্সক্ষা লালন না করে আঁকাবাঁকা পথ চলেননি কখনো। একজন যোগ্য কর্মী পদসর্বস্ব নেতার চেয়ে বেশি দামি- এমনটাই মনে করেন তিনি। ওপেন হার্ট সার্জারি করা কামরুল আলম খান খসরুর ফোনালাপের বেলায়ও চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন না। টিঅ্যান্ডটিতেও তাকে পাওয়া বড় দায়। আজিমপুরে বাসায় হাজির হলে আলাপচারিতার শুরুতেই খসরুর কণ্ঠ ভাবগম্ভীরতায় ঢেকে গেল। বোঝা গেল, বড় কষ্ট তাকে ধুঁকে ধুঁকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। সেই কষ্ট খোলাসা করে না বললেও বলেছেন আগামী বিজয় মাসের শুরুতে বলবেন। যদি এ পর্যন্ত বেঁচে যান। বিজয় মাসে কেন? খসরুর জবাব, ডিসেম্বর এলে আমি পুলকিত না হয়ে পারি না। কারণ ওর মধ্যেই আমার নিজের অস্তিত্ব অনুভব করি। কোনো পরাজয়ই আমার ওই বিজয়কে ভুলিয়ে দিতে পারে না। খসরুর সাফ কথা- মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস সবাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ছাত্রলীগকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগ না হলে বাংলাদেশ হতো না। স্বাধীনতার প্রধান দাবিদার আওয়ামী লীগ নয়, ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগই দেশকে শত্রুমুক্ত করেছে। আজ যারা আবোলতাবোল বকছেন, তারা ইতিহাসের শত্রু। বঙ্গবন্ধু এই সত্য উপলব্ধি করতেন বলেই বলেছিলেন, ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের খাটো করে দেখার জন্যই আজকে স্বাধীনতার পরাজিতরা হুঙ্কার দেওয়ার সাহস পাচ্ছে। আজ আর নয়, ডিসেম্বর আসুক সব বলব- যা বলিনি কখনো।

লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। বানান, শব্দ, বাক্য সবকিছু অপরিবর্তীত।