কবীর চৌধুরী তন্ময়: একটি দেশ তখনই শক্তিশালী হয় যখন সে দেশের মানুষের মাঝে দেশাত্মবোধ গভীরভাবে কাজ করে। আর দেশাত্মবোধ বা দেশপ্রেম তখনই মন-মগজে মর্যাদা পায় যখন সে দেশের জনগণ তার জন্মভূমির সঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাশোনা থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পঁচাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম বারবার একটি জায়গায় প্রতিনিয়ত প্রত্যারণার শিকার হয়েছে, বিকৃতি ইতিহাস পড়ে বিভ্রান্ত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবেই দেশ ও দেশের মানুষকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে, মানুষের ভেতর ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে এবং সর্বোপরি দেশাত্মবোধ থেকে দূরে রাখতেই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করেছে, পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে ভ্রান্ত পথে রীতিমতো ঠেলে দিয়েছে! তার একটাই কারণ, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে-আঘাত করা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া’র মীমাংসার মিথ্যাচার বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল-নকশা; বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা! স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করতে পারলে, বিকৃতি ইতিহাস মন-মগজে স্থাপন করে বিভ্রান্ত আর বিভাজন সৃষ্টি করতে সক্ষম হলে- ঘুরে দাঁড়ানো বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

ষড়যন্ত্রকারীরা জানে বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম ছিল বাঙালির জন্য, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য। পৃথিবীর যেখানে শোষণ হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শোষিতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। মানুষ-মানবতা যেখানে নির্যাতন-নিপীড়ন হয়েছে, বঙ্গবন্ধু তাদের একজন হয়ে অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। শত লোভ-লালসা আর মৃত্যুর কবর দেখিয়েও বঙ্গবন্ধুকে মা-মাটি আর মানুষ-মানবতা থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়নি। বিশ্ব পরাশক্তি আমেরিকা-পাকিস্তান মিলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে যখন বঙ্গবন্ধু ও বাঙালিকে ধ্বংস করতে পারেনি, তখন পরিকল্পিতভাবে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল স্রোতধারা ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ছায়া সরকারের আদলে পরিচালনা করতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে শুধু খুনিদের বিচারকাজই বন্ধ করেনি বরং খুনের মহাপরিকল্পনারকারীদেরও দায়মুক্তি দিয়েছে। রাতারাতি ‘জয় বাংলা’ হয়ে যায় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। ‘বাংলাদেশ বেতার’কে রেডিও পাকিস্তানের আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ করে! পাকিস্তানের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সংবিধান কেটে ক্ষত-বিক্ষত করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদেরও এদেশে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ‘অসাম্প্রদায়িক’ স্বাধীন-সার্বভৌমত্বকে ‘সাম্প্রদায়িক’ রাষ্ট্র গঠনে চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা প্রণয়ন করে জিয়াউর রহমান।

ঠিক এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে মানুষ আর মানবতার ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সেদিন তার জীবনের ন্যায় প্রকৃতিও একাকার হয়েছিল। চারপাশে ঝড়-বৃষ্টি। কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে। সেদিন স্বতঃস্ফূর্ত লাখ লাখ মানুষকে ঝড়-বৃষ্টিও যেন স্নান করিয়ে দিয়েছিল। উত্তেজিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের মাঝে প্রকৃতিও তার পরমতসহিষ্ণুতা আর শান্তি বার্তা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আগমন ঘিরে। আর শেখ হাসিনাকে এক পলক দেখতে সেদিন সারা বাংলাদেশের মানুষের গন্তব্য ছিল রাজধানী ঢাকা। স্বাধীনতার অমর স্লোগান, আবারো ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় বাংলার আকাশ-বাতাস। জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষিত হয়েছিল ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম- পিতৃ হত্যার বদলা নেব’। ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম।’

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ঝড়-বাদল আর জনতার আনন্দাশ্রুতে অবগাহন করে শেরেবাংলা নগরে লাখ লাখ জনতার সংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’

সেদিন তিনি আরো বলেছিলেন ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই-রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’

শুরু হয় শেখ হাসিনার নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সংগ্রাম। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার একটানা অকুতোভয় রাজনৈতিক আন্দোলন। জেল-জুলুম-অত্যাচার কোনো কিছুই তাকে তার সংগ্রামী পথ থেকে টলাতে পারেনি। শত-সহস্র প্রতিক‚লতাতেও হতদ্যোম হননি তিনি। বাংলার মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বারবার স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন, আবির্ভূত হয়েছেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা রূপে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাষ্ট্রীয়ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের উন্নয়নের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের ইতিহাস রচনা শুরু হয়। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বয়ম্ভর বিদু্যুৎ উৎপাদনকারীদের মাধ্যমে এই সেক্টরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ চালু করা এবং ১৯৯৮ সালে শতাব্দীর ভয়াবহতম বন্যা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মূল্যস্ফীতি ১৯৯৬ সালের ৮.৯ শতাংশ থেকে ২০০১ সালে ১.৯ শতাংশে নেমে এসেছিল, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আগের সরকারের ৪.৫ শতাংশের তুলনায় প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট থেকে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, খাদ্যশস্য উৎপাদন ২ কোটি ৬৮ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছিল।

প্রথমবারের মতো ১৯৯৮ সালে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকল্পে শেখ হাসিনা সেইফটি নেট কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’-এর মতো দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী কর্মসূচি। বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার মতো উদ্ভাবনী কর্মসূচিগুলোর সূচনাও ঘটে ওই সময়ে। প্রান্তিক কৃষকের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা দেশে প্রথমবারের মতো কৃষকের জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্রদান করেন। নাগরিকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার ওপর জোর দিয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রতি ৬ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছেন। মোবাইল ফোন খাতের একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটিয়ে স্বল্পমূল্যে সবার কাছে মোবাইল ফোন সহজলভ্য করেছেন। বাংলাদেশকে ফাইবার অপটিক্যাল কেবলের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কমিয়ে সরকার তথ্যপ্রযুক্তিকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলেন যার ফলে বাংলাদেশ ডিজিটাল ও প্রযুক্তির আধুনিক যুগে প্রবেশের সুযোগ পায়। পরিবহন খাতের বিকেন্দ্রীকরণ বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন।

আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচন বিশ্ব আঙিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

যে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, সেই তিনিই ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনাকে ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাফল্যের স্তুতি বর্ণনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।

১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রথম যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সেখানে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ একটি নাজুক ও জটিল উন্নয়ন সমস্যার নাম।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে প্রথম আখ্যায়িত করেছিলেন Just Faaland ও John Richard Parkinson নামক দুজন অর্থনীতিবিদ। তাদের রচিত Bangladesh : the test case of development শীর্ষক বইতে বাংলাদেশ সম্পর্কে অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, ‘যদি বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারে তাহলে পৃথিবীর যে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারবে।’ তাদের কথা ভুল প্রমাণিত করে ১৯৯৬-২০০১ সালে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য মর্যাদা পুনরায় ফিরে পেয়েছিল শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে।

এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে চার-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হয়। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আবারো প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আর গত দশ বছর বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্জন সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

এক সময় দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষে জর্জরিত যে বাংলাদেশ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করত, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বজয়ের নবতর অভিযাত্রায় এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব, যোগ্যতা, নিষ্ঠা, মেধা-মনন, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী নেতৃত্বে। বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ, গৌরবময় হয়েছেন বাঙালি যা অর্জনে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন শেখ হাসিনা।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নেও শেখ হাসিনা জনগণের ‘জীবন’ ও ‘জীবিকার’ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিঃস্বার্থভাবে নিরলস পরিশ্রম করেছেন, করে যাচ্ছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট সংকটের শুরু থেকেই তিনি এ ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে জাতির অভিভাবক হিসেবে ৩১ দফা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন বারবার।

আমাদের সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে পেছনে ফেলে ‘পেটে খেলে পিটে সয়’-স্লোগানকে সামনে রেখে ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগ, এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাসহ কৃষকের পেটের ভাতের ব্যবস্থা ‘ফসল’ ঘরে উঠেছে- একমাত্র শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে। আর কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করে ১০ মিলিয়নের বেশি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার সরকার।

মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে, সেখানে শেখ হাসিনার সাহসী আর বিচক্ষণ পদক্ষেপ-বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের ২০২০ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতজুড়ে হৈচৈই শুরু হয়েছে। কারণ, রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ২০২০ সালে চলতি মূল্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১ হাজার ৮৮৭ দশমিক ৯৭ মার্কিন ডলার। আর ২০২০ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১ হাজার ৮৭৭ মার্কিন ডলার। এর পাশাপাশি ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং ভারতের জিডিপি ১০ দশমিক ৩ শতাংশ কমবে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অর্থনীতির এই সফলতা নিয়ে বাংলাদেশে তেমন আলোচনা না হলেও ভারতজুড়ে বিষয়টি তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় সব মিডিয়ায় এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্লেষণ-বিতর্ক। আইএমএফের তথ্যটি বিশেষভাবে সবার নজর কেড়েছে, কারণ বিগত ৫ বছর ধরে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশ থেকে গড়ে ২৪% বেশি ছিল! আর সেখানে তারাই পেছনে পড়তে বসেছে!

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ ৩৯ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের এ পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না-ছিল কণ্টকাপূর্ণ ও বিপৎসঙ্কুুল। গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তাকে বারবার ঘাতকদের হামলার শিকার ও কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে, বাঙালির নৈতিক অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন পিতার মতোই অবিচল, দৃঢ় ও সাহসী আর আপোসহীন। জনগণের ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়ে টানা তৃতীয়বারসহ চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছেন। ‘রূপকল্প ২০২১’ এর মধ্যম আয়ের বাংলাদেশকে ‘রূপকল্প ২০৪১’ এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত, আধুনিক, সমৃদ্ধ, অসাম্প্র্রদায়িক কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, প্রতীয়মান।

গণতন্ত্র, শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং নারী শিক্ষার বিস্তার, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনের সংগ্রামে অসামান্য ভ‚মিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে দেশি-বিদেশি বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মানে ভ‚ষিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এর মধ্যে সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কার-২০১৪, শান্তি বৃক্ষ-২০১৪, জাতিসংঘ পুরস্কার-২০১৩ ও ২০১০, রোটারি শান্তি পুরস্কার-২০১৩, গোভি পুরস্কার-২০১২, সাউথ-সাউথ পুরস্কার-২০১১, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০১০, পার্ল এস. বার্ক পুরস্কার-২০০০, সিইআরইএস মেডাল-১৯৯৯, এম কে গান্ধী পুরস্কার-১৯৯৮, মাদার তেরেসা শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮, ইউনেস্কোর ফেলিক্স হোফুয়েট-বোয়েগনি শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮ প্রভৃতি উল্লেযাগ্য। এ ছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারেও ভ‚ষিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও প্রদান করেন।

এদেশের জন্য, এদেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন, অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন সর্বকালের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর পাকিস্তানপন্থি, চীনপন্থি, রাশিয়াপন্থি, আমেরিকাপন্থি, ভারতপন্থি, সৌদি-আরবপন্থিসহ নানানপন্থি রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের মাঝে বঙ্গবন্ধুর পরে একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি করে বাংলাদেশকে মর্যাদাশীল রাষ্ট্র বানাতে সক্ষম হয়েছেন। চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় জেল-জুলুমের সঙ্গে যার দিকে বারবার বন্দুক তাক করা হয়েছে, যার দিকে বার বার সন্ত্রাসীর বোমা-গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, যাকে রক্তাক্ত ও কণ্টকাকীর্ণ পথেও দমাতে পারেনি; তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, অবিরাম ছুটে চলেছেন দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্য অর্জনে। মুক্তিযুদ্ধের মূল স্রোতধারা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার সংগ্রামে তিনি অবিচল ছুটে চলা সাহসী যোদ্ধা। পাকিস্তানের জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে, বারবার মৃতুর মুখে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে অধিকারবঞ্চিত বাঙালিদের যেভাবে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু, ঠিক তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই মানুষ তার অধিকারবঞ্চিত হবে, যেখানেই শোষণ আর নির্যাতনের শিকার হবে, নিষ্পেষিত হবে মানুষ আর মানবতা; সেখানেই জ্যোতির্ময়ী হয়ে আবির্ভূত হবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা-এটাই মানবজাতির প্রত্যাশা।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)।