রিপাবলিকান দলীয় প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। পেনসিলভ্যানিয়ায় জয়লাভ করায় বেসরকারি ফলাফলে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। খবর: সিএনএন

সিএনএন-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, জো বাইডেনের প্রাপ্ত ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ২৭৩। এদিকে বিবিসির পূর্বাভাসও তাই বলছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাইডেনের প্রাপ্ত ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ২৯০, আর রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ২১৪।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জো বাইডেন ২৭৩টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছেন। আসছে জানুয়ারিতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, যদিও তা নির্ভর করবে আইনগত চ্যালেঞ্জের ফলাফলের ওপর।

ভোটের ফলাফলের হিসাবে পেনসিলভেনিয়ায় জো বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। পেনসিলভেনিয়ায় জেতার মাধ্যমে বাইডেন সেখানকার ২০টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে গেলেন।

একইসঙ্গে প্রথম নারী ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন কমলা হ্যারিস।

এখনও নর্থ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা, নেভাদা ও আলাস্কা- এই পাঁচটি রাজ্যের ফল ঘোষণা বাকি রয়েছে। এর মধ্যে জর্জিয়ার ভোট পুনঃগণনা হচ্ছে।

নির্বাচনের ফল জানতে সবার দৃষ্টি ছিল পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের দিকে। এই রাজ্যে জিতলেই বাইডেনের জয় নিশ্চিত হতো। হয়েছেও সেটাই। পেনসিলভানিয়ায় জয়ের ফলে আগেই ২৫৩ ইলেকটোরাল ভোট পাওয়া বাইডেনের মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭৩। বাকি পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প জয় পেলেও তার ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৬৫।

এদিকে আগে থেকেই জয়ের আভাস দিচ্ছিলেন জো বাইডেন। শুক্রবার রাতে ডেলওয়্যারে নিজ শহর উইলমিংটন থেকে দেয়া এক ভাষণে বাইডেন বলেছিলেন, আমরা এখনও বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা পাইনি। তবে সংখ্যা বলছে এটি পরিষ্কার, আমরা এই প্রতিযোগিতায় জিতে যাচ্ছি। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলেছিলেন, আমরা সাত কোটি ৪০ লাখের বেশি ভোট পেয়েছি; যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পাননি।

এদিকে ভোট গণনার শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোট জালিয়াতির কথা বলে আসছিলেন।

তবে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনার এলেন ওয়াইনট্রাব বলেছেন, এ বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতির কোনো প্রমাণ মেলেনি।

শনিবার সিএনএনকে তিনি বলেন, রাজ্যের ও স্থানীয় কর্মকর্তারা, সারা দেশের নির্বাচন কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। নির্বাচন যেভাবে হয়েছে তা নিয়ে খুব সামান্য কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমি বলতে চাই, ভোট জালিয়াতির কোনো ধরনের প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।

তিনি আরও বলেন, জালিয়াতির কোনো অভিযোগ কোথাও পাওয়া যায়নি। যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানেও কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

চলুন জেনে নেয়া যাক জো বাইডেনের জীবনের গল্প-

জন্ম ও পরিবার
১৯৪২ সালের ২০ নভেম্বর স্ক্র্যানটন পেনসিলভ্যানিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র বা আজকের ‘জো বাইডেন’৷ জীবনের প্রথমভাগ বাইডেন কাটান দাদা-দাদির সাথে৷ পরিবারে আর্থিক অনটন থাকলেও বাইডেন স্কুলজীবনে তুখোড় ফুটবল, বেসবল খেলোয়াড় ছিলেন, যা পরে বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে৷ জানা যায়, ছোটবেলায় বাইডেন কথা বলতে গেলে তোতলাতেন, যা কবিতা আবৃত্তি করার মাধ্যমে পরে নিয়ন্ত্রণে আনেন তিনি।

তারুণ্য
প্রথমে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হবার পর আইনে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা করতে বাইডেন পাড়ি দেন নিউ ইয়র্কের সাইরাক্যুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ সেখানেই তাঁর পরিচয় নেলিয়া হান্টারের সাথে৷ ১৯৬৬ সালে নেলিয়া ও বাইডেন বিয়ে করেন।

রাজনীতিতে পদার্পণ
১৯৭২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়েসে ডেলাওয়ারে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সেনেটর কেলেব বগসের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে লড়েন বাইডেন৷ অর্থাভাব, রাজনীতির ময়দানে অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও পারিবারিক সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে প্রচার চালিয়ে গবসকে পরাজিত করেন বাইডেন৷ সেখান থেকেই ডেমোক্র্যাট হিসাবে তাঁর উত্থানের সূত্রপাত।

পারিবারিক বিপর্যয়
সেনেটর নির্বাচিত হবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাইডেনের জীবনে আসে বিপর্যয়৷ একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী নেলিয়া ও কন্যা নাওমির মৃত্যু হয়৷ মারাত্মকভাবে জখম হন তাঁর দুই পুত্রও৷ এই বিপর্যয়ের কারণে রাজনীতি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন বাইডেন৷ কিন্তু দলের জোরাজুরিতে হাসপাতালেই সেনেটর পদে শপথগ্রহণ করেন বাইডেন৷ পরে ১৯৭৭ সালে জিল জেকবসকে বিয়ে করেন বাইডেন৷ তাঁদের একটি কন্যা রয়েছে, নাম অ্যাশলি।

রাজনীতির চেয়ে পরিবারকে প্রাধান্য
বাইডেনের পারিবারিক জীবনে আবার বিপর্যয় আসে ২০১৫ সালে৷ ভাইস-প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ব্রেন টিউমারজনিত জটিলতায় তিনি তাঁর পুত্র জোসেফকে হারান৷ পরের বছর ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে লড়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরিবারকে সময় দিতে নির্বাচন থেকে সরে আসেন বাইডেন।

তবুও উত্তরণ
এর আগে ১৯৮৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে অংশগ্রহণ করলেও প্রাইমারি নির্বাচনের আগেই নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন৷ কিন্তু সেনেটর হিসাবে কাজ করে যান তিনি৷ ২০০৮ সালেও প্রথমে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তিনি৷ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসাবে ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম’ প্রদান করেন।

গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
রাজনীতির শুরু থেকেই বাইডেন ক্রেতা সুরক্ষা ও পরিবেশবিষয়ক ইস্যু নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন৷ ২০১০ সালের ‘পেশেন্ট প্রোটেকশান অ্যান্ড অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার’ আইনের বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকার কথা বারবার আলোচিত হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, ১৯৯২ সাল থেকেই আইনি কড়াকড়ি বাড়ানো ও সাজার মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে তাঁর অবস্থান তিনি স্পষ্ট করেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর দলের নীতির সাথে পুরোপুরি খাপ খায়নি।

বাইডেনকে ঘিরে বিতর্ক
১৯৮৮ সালের নির্বাচনি প্রচারের সময় বাইডেনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নিল কিনকের বক্তব্য চুরির অভিযোগ ওঠে৷ এছাড়া অ্যামেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণভিত্তিক বিভেদপন্থিদের সাথে সুর মিলিয়ে আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে সমালোচিত হন বাইডেন৷ ২০১২ সালেও সমকামী জুটিদের বিয়ের অধিকারের পক্ষে কথা বলে বাইডেন শিরোনামে উঠে আসেন।

যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
২০২০ সালের মার্চ মাসে টারা রিড অভিযোগ আনেন যে ১৯৯৩ সালে জো বাইডেন তাঁকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন৷ সেনেটর থাকাকালীন বাইডেনের অফিসে সহযোগী হিসাবে কাজ করতেন রিড৷ ১৯৯৩ সালে বিষয়টি আলোচিত হবার পর নতুন করে এবছর আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রেক্ষিতে সেটি আলোচনায় উঠে আসে৷ এই অভিযোগ বাইডেন উড়িয়ে দিলেও আরো কয়েকজন নারী বাইডেনের বিরুদ্ধে অসঙ্গত আচরণের অভিযোগ এনেছেন।

বাইডেনের যত নাম
গণমাধ্যমে বাইডেনের নামের সাথে জুড়েছে নানা ধরনের বিশেষণ৷ জীবনের গোড়ার দিকের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে কখনো তাঁর নাম হয়েছে ‘মিডল ক্লাস জো’৷ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় বয়সের কারণে ডনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে তাচ্ছিল্য করে বলেন ‘স্লো জো’ ও ‘স্লিপি জো’।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসাবে অংশগ্রহণ করেন জো বাইডেন৷ তার পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচারে নেমেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা৷ টুইটার-ইন্সটাগ্রামে পাশে দাঁড়ান সেলেব্রেটিরাও৷ শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন বাইডেন।